শনিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০১৬

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

মহান মে দিবস’র তাৎপর্য : বর্তমান প্রেক্ষাপট


আজ পহেলা মে, মহান মে দিবস। শোষণের বিরুদ্ধে শোষিত মানুষের অধিকার আদায়ে ঐতিহাসিক সংগ্রামের দিনটাই হচ্ছে মহান মে দিবস। পৃথিবীর সব দেশে যথাযথ মর্যাদার সাথে ঐতিহাসিক মহান মে দিবস পালন করবে দুনিয়ার সকল মজদুর মানুষ। যাদের রক্ত ও ঘামের বিনিময়ে আজকের আধুনিক বিশ্বের এ যান্ত্রিক বিশ্বায়ন সেই যান্ত্রিক বিশ্বায়নের নির্মাতা দুনিয়ার সব শ্রমজীবী মানুষের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, সম্মান ও লাল সালাম নিবেদন করছি এই লেখার মধ্যদিয়ে।
আজ বাংলাদেশে সরকারি ছুটি। দেশের রাজনৈতিক সামাজিক ও শ্রমজীবী সংগঠনগুলো মে দিবস পালন করবে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে।
জুলুমের বিরুদ্ধে মজলুমের জয় হবেই একদিন না একদিন। তাই ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও লড়াই কর’ শ্লোগানটি মে দিবসে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। লড়াইয়ের শুরুটা হয়েছিল ১৮৮৬ সালে পহেলা মে। এই দিন আমেরিকার শিকাগো শহরে হে মার্কেটে। মানবের প্রতি দানবীয় শ্রমঘন্টার বিরুদ্ধে ৮ ঘন্টা কাজের দাবিতে সেই দিন লক্ষ-লক্ষ মানুষ ন্যায্য অধিকার আদায়ে সমবেত হয়েছিল শিকাগোর হে মার্কেটে। ১লা মে’র শিকাগো ধর্মঘট শেষ পর্যন্ত রক্ত সংগ্রামে পরিণত হয়। পহেলা মে ধর্মঘট এক পর্যায়ে অবস্থান কর্মসূচিতে পরিণত হয়। অব্যাহত ধর্মঘট চলাকালে ৩ মে রাজপথের বিক্ষোভ মিছিলে শাসক গোষ্ঠির পুলিশি অভিযানে প্রাণ হারান ৫ জন কর্মবীর শ্রমিক। নিরস্ত্র শ্রমজীবী মানুষের উপর অস্ত্রধারী পুলিশের হামলার প্রতিবাদে বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষ সোচ্চার হয়ে উঠে। পরে ১৮৯০ সালে গ্রেট ব্রিটেনের হাইড পার্কে লাখো শ্রমিকের সমাবেশে মে দিবস পালন করা হয়। এর আগে ১৮৮৯ সালে প্যারিসে ২য় আন্তর্জাতিক সম্মেলনে আন্তর্জাতিকভাবে ১লা মে মহান মে দিবস পালনের সিদ্ধান্ত হয়। ধীরে-ধীরে ১লা মে শ্রমজীবী মানুষের প্রতি সংহতির প্রতীক হিসেবে মহান মে দিবস পৃথিবীর দেশে-দেশে যথাযোগ্য মর্যাদা লাভ করে, সেই থেকে মহান মে দিবস পালন করা হচ্ছে। কিন্তু দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় হচ্ছে এ যেন দিবস আছে রজনী নেই, শোষণ বঞ্চনা ও অমানুষিক নির্যাতন যেন শ্রমজীবীর মানুষের পিছু ছাড়ছে না। ১৮৮৬ থেকে ২০১৫ সাল কালের ব্যবধান ভিন্ন হলেও এখনও অভিন্ন শ্রমজীবী মানুষের সেই দাবি অপূরণই থেকে গেল। কেবল দিবস আসলেই আমরা শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য অধিকারের কথা বলি কিন্তু বাস্তবে মজদুর মেহনতি মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে শাসক, প্রশাসক ও মালিকগোষ্ঠি আদৌ আন্তরিক হতে পারিনি। যদিও সময়ের ব্যবধানে শ্রমজীবী মানুষের যান্ত্রিক বিপ্লবের কারণে কাজের পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু পরিবর্তন আসেনি জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা অধরাই থেকে গেল। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ৮ ঘন্টা কাজের সেই দাবি এখনও দাবির মিছিলে শ্লোগান হয়ে আছে আজ ঐতিহাসিক মহান মে দিবস। এ উপলক্ষে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী বিশেষ বাণী প্রদান করেন। দেশের শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে মহান মে দিবসের বাণী যেন বাণী না হয়ে আশার বাণী হয়।
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় যদি বলতে হয়-
‘এই পৃথিবীর যা কিছু মহান-
যা কিছু কল্যাণকর
অর্ধেক তার গড়িয়েছে নারী
অর্ধেক তার নর।’
কিন্তু পোষাক শিল্পের বিকাশে নরের চেয়ে এই দেশে নারীর শ্রমিকের অবদান অনেক বেশি। কিন্তু দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় , যে নারী শ্রমিকের অবদানে দেশের জাতীয় অর্থনীতি সমৃদ্ধ হচ্ছে সেই নারী শ্রমিকের চলমান জীবনযাপন বড়ই দুর্বিষহ। বেতনের সাথে যাদের জীবনযাত্রার ব্যয় খাপ খায় না তারাই হলেন গার্মেন্টস শ্রমিক। যারা দিনের সূর্য উঠার আগে চোখে ঘুম নিয়ে বিছানা ছাড়ে সেই গার্মেন্টস শ্রমিকদের দূর্ভাগ্য যেন পিছু ছাড়ে না। একের পর এক ট্রাজেডি শিকার হচ্ছে দেশের পোষাকশিল্প শ্রমিক। বাংলাদেশের পোষাক শিল্পে শ্রমজীবী মানুষের দুঃসহ স্মৃতির তীব্র যন্ত্রণা রানা প্লাজা ট্রাজেডি। রানা প্লাজা ট্রাজেডিতে নিখোঁজ ১০৫ জন শ্রমিকের সন্ধান দীর্ঘ তিন বছরেও মিলেনি। যে ট্রাজেডিতে ১১৩৫ জন মানুষকে নির্মমভাবে প্রাণ দিতে হয়েছে। ঘটনার ৩ বছর  পূর্ণ হলেও অনেকের কপালে ক্ষতিপূরণের অর্থও জোটেনি। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজা ভবন ধসে পড়ে। ধসে পড়ার আগে ভবনে বড় ধরনের ফাটল দেখা দিলেও ভবন মালিক খামখেয়ালিপনার কারণে এই ট্র্যাজেডি সৃষ্টি হয়েছে বলে প্রতিয়মাণ হয়। ভবন মালিক সোহেল রানার বিরুদ্ধে সারাদেশের মানুষ সোচ্ছার হয়ে উঠেছিল। সহস্রাধিক মানুষের মৃত্যুর জন্য সোহেল রানার বিচারের জন্য দেশবাসী অপেক্ষার প্রহর গুনছে গত ৩ বছর থেকে। কিন্তু দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় এই ঘটনার চার্টশিট এখনও দেওয়া হয়নি। শুধু তাই নয়, দীর্ঘ ৩ বছরেও অনেকে ক্ষতিপূরণের অর্থ পায়নি। এই ব্যর্থতার দায় কার? শ্রমিকের ক্ষতি পূরণ পাওয়া করুণা নয়- অধিকার। আমরা কি পেরেছি রানা প্লাজার ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে? রানা প্লাজার ঘটনায় স্বজনহারা মানুষের আর্তনাদের   আহাজারী এখন চলছে। এর আগে ২০১২ সালে নবেম্বর মাস ঢাকার তাজরীন ফ্যাশনে ১১২ জন পোষাক শ্রমিকের মৃত্যু ঘটে। এ ধরনের অনেক দুর্ঘটনা ঢাকা চট্টগ্রামের পোষাক শিল্পের দুঃসহ যন্ত্রণার ইতিহাস হয়ে আছে। বাংলাদেশে কাজের ক্ষেত্রে পোষাক শ্রমিকের পর নির্মাণ শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্র অনেক ঝুঁকিপূর্ণ। এসব ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় যাদের রক্ত ও ঘাম মিশে আছে সেই তারা তাদের শ্রমের ন্যায্য পাওনা অনেক সময় পায় না। শ্রম দিয়ে যারা শ্রমের মূল্য পায় না তারাই জানে জীবন সংগ্রামে বেঁচে থাকার লড়াই কত কষ্টের?
শ্রমের মর্যাদা ও শ্রমিকের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও ) এবং দেশের শ্রম আইন সংবিধান অনুসারে শ্রমিক শ্রেণীর মানুষের ন্যায্য অধিকার সংরক্ষিত আছে। কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষের অধিকার যেন কিতাবে আছে গোয়ালে নেই। বরাবরই এই দেশের দিনমজুর শ্রেণীর মেহনতি মানুষ বঞ্চিত ও শোষিত। শুধু গার্মেন্টস শিল্পে নয় ওয়ার্কসপ বিভিন্ন মিল, ফ্যাক্টরি ও ব্রিকফিল্ড শ্রমিকের পর সবচেয়ে বেশি শোষণের শিকার হয় ঘরের গৃহকর্মীরা। গায়ে কেরোসিন ঢেলে গরম ইস্ত্রির সেকা দিয়ে পিট ঝলসিয়ে দেওয়া ঘটনা অহরহ। শুধু তাই নয় গৃহ কর্মীদের উপর বর্বর নির্যাতনের পাশাপাশি খুন ধর্ষণও করা হচ্ছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় যে গৃহকর্মী নির্যাতনে পুরুষের চেয়ে নারীরাই বেশি এগিয়ে। নারী হয়ে নারীর উপর বর্বরতা নষ্ট সমাজের নিদর্শন। ইসলামের দৃষ্টিতে শ্রমজীবী মানুষের মর্যাদা অনেক বেশি। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সেই সব মানুষকেই বেশি ভালবাসেন যারা সৎ এবং মেহনত করে। তাই শ্রমিকের ঘাম শুকাবার আগেই ন্যায্য পাওনা পরিশোধের তাগিদ দিয়েছে ইসলাম। এই দেশের মজদুর মানুষের জীবনসংগ্রামের অব্যক্ত কাহিনী আর নয় এবারের মহান মে দিবস মজদুর মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার দিন হোক এই প্রত্যাশার দেশের সকল মেহনতি মানুষের সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করছি। লাল সালাম সকল শ্রমজীবী মানুষের প্রতি।

শুক্রবার, ২৯ এপ্রিল, ২০১৬

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

গণতন্ত্র তো বটেই, তবে...


কিছুদিন আগেও সরকারের নীতি ও কার্যক্রমের মধ্যে যারা বাকশাল-এর পথে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্য খুঁজে বেড়াতেন তাদেরই একটি অংশ আজকাল নিজেদের বক্তব্যে অদল-বদল করতে শুরু করেছেন। বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের নামে হত্যাসহ ভয়ংকর সব কর্মকাণ্ড দেখার পর এখন তাদের ধারণা, উদ্দেশ্য একদলীয় শাসন হলেও ক্ষমতাসীনরা সম্ভবত ভিন্ন কোনো কৌশল নিয়েছেন। এ প্রসঙ্গেই বহুদিন পর আবারও আলোচনায় এসেছেন পাকিস্তানের সবচেয়ে বেশিদিন ক্ষমতায় থাকা সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল মোহাম্মদ আইয়ুব খান। ১৯৫৮ সালের ২৭ অক্টোবর ক্ষমতা দখল করার এবং প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকে ১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ প্রচণ্ড গণঅভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করে সরে যাওয়ার আগেও তার ইতিহাস রয়েছে। বস্তুত ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই পরোক্ষভাবে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ করেছেন আইয়ুব খান। এমনকি চাকরিরত অবস্থায় নিজে মন্ত্রী পর্যন্ত হয়েছেন (১৯৫৪)। তার চাপেই পাকিস্তান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে একের পর এক যুদ্ধজোটে যোগ দিয়েছে। সামরিক চুক্তির আড়ালে পাকিস্তানকে যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছাধীন রাষ্ট্রে পরিণত করেছিলেন আইয়ুব খান। এর ফলে মুসলিম রাষ্ট্র হলেও গোটা মুসলিম বিশ্বই পাকিস্তানকে ঘৃণার চোখে দেখেছে। এ অবস্থার সুযোগ নিয়েই সৌদি আরব, ইরাক ও মিসরসহ মুসলিম দেশগুলোতে ঢুকে পড়েছিল ভারত। ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে সিনেমা ও সংস্কৃতির মতো প্রতিটি বিষয়েই দেশটির সেকালের অনুপ্রবেশ পরবর্তীকালে বিষময় প্রমাণিত হয়েছে। এখনো মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো ভারতীয় প্রভাবের বাইরে আসতে পারেনি।
অমন অবস্থার কারণ পর্যালোচনায় দেখা গেছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালে প্রতিটি মুসলিম দেশ যেখানে সাম্রাজ্যবাদী শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিল, জেনারেল আইয়ুব খানের কারণে পাকিস্তান সেখানে বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেবাদাসের ভূমিকা পালন করতে শুরু করেছিল। ওদিকে ব্রিটেন ও ফ্রান্সসহ দু-আড়াইশ বছরের সাম্রাজ্যবাদী শক্তি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র তাদের শূন্যস্থানটি পূরণ করতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্র সত্যি সত্যিই সাম্রাজ্যবাদী দুনিয়ার নতুন মোড়লে পরিণত হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সে অবস্থান এখনো বহাল রয়েছে। 
জেনারেল আইয়ুব খান সম্পর্কিত আলোচনার শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রকে টেনে আনার কারণ হলো, দেশটি পাকিস্তানকে ভারতের দখল থেকে অধিকৃত কাশ্মীর উদ্ধার করে দেয়ার অঙ্গিকার করেছিল। কিন্তু ১৯৪৮ এবং ১৯৬৫ সালের দুই-দুটি যুদ্ধের পরও পাকিস্তান কাশ্মীরকে ফিরে পায়নি। মাঝখান দিয়ে দেশটি বাংলাদেশকে খুইয়েছে। কোনো একটি সংকট ও যুদ্ধের ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের পক্ষে কার্যকর ভূমিকা পালন করেনি। যা করেছে সবই অভিনয় হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এমনকি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হঠাৎ ‘নিরপেক্ষ’ সাজার ঘোষণা দিয়ে পাকিস্তানকে বিপন্নও করেছিল। কারণ, ভারতের অস্ত্রশস্ত্র আসতো রাশিয়া তথা তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে। ভারত একই সঙ্গে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকেও অস্ত্রশস্ত্র কিনতো। অন্যদিকে পাকিস্তান অস্ত্রশস্ত্রের জন্য সর্বতোভাবে নির্ভরশীল ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও তার জোটের বন্ধুদের ওপর। সে দেশগুলোই হঠাৎ ‘নিরপেক্ষ’ হয়ে যাওয়ায় পাকিস্তানের অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়েছিল। পাকিস্তানকে তখন রক্ষা করেছিল তার ‘অবন্ধুসুলভ’ প্রতিবেশী হিসেবে বর্ণিত রাষ্ট্র রাশিয়া। দেশটির প্রধানমন্ত্রী আলেক্সি কোসিগিনের মধ্যস্থতায় তাসখন্দে সম্পাদিত শান্তি ও যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাধ্যমে সেবারের মতো বেঁচে গিয়েছিল পাকিস্তান। ভারতের প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের সঙ্গে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। এসব ১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের ঘটনা। ১৯৭১ সালেও যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের সঙ্গে একই ধরনের ব্যবহার করেছিল।
আইয়ুব খানের পতনের পর মাঝখানে বহু বছর কেটে গেছে। কিন্তু সুদীর্ঘ এ সময়ের ব্যবধানেও পাকিস্তানের প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতি-মনোভাব ও কার্যক্রমে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেনি। বর্তমান সময়ে পাকিস্তান বিপদে রয়েছে তালেবান ও নানা নামের ইসলামী বলে বর্ণিত জঙ্গিদের নিয়ে, যারা আসলে যুক্তরাষ্ট্রেরই সৃষ্টি বলে প্রচারণায় বলা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, সব মিলিয়ে পাকিস্তান এখন একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। আর সব কিছুর পেছনেই রয়েছে সাম্রাজ্যবাদী দুনিয়ার মোড়ল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তথাকথিত ‘লৌহ মানব’ আইয়ুব খান।
এমন মন্তব্যের কারণ বোঝানোর জন্য কয়েকটি তথ্যের উল্লেখ সেরে নেয়া যাক। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের প্ররোচনায় একের পর এক সামরিক চুক্তি ও যুদ্ধজোটে অংশ নেয়ার মাধ্যমে পাকিস্তান মুসলিম বিশ্বের পাশাপাশি ১৯৪০ ও ১৯৫০-এর দশকে স্বাধীনতা অর্জনকারী অন্য অনেক রাষ্ট্রেরও শত্রুতে পরিণত হয়েছিল। দ্বিতীয়ত, পাকিস্তান ভারতের অধিকৃত কাশ্মীরকে উদ্ধার করতে পারেনি। তৃতীয়ত, পাকিস্তান ও ইরানসহ কয়েকটি মুসলিম রাষ্ট্রকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মতো সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর যুদ্ধংদেহী নীতি ও কর্মকাণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে গঠিত হয়েছিল ‘জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন’ নামের নতুন বিশ্ব সংস্থা। পাকিস্তানকে এতে ঢুকতেই দেয়া হয়নি। অন্যদিকে যুগোস্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট যোসেফ টিটো এবং মিসরের প্রেসিডেন্ট জামাল আবদুন নাসেরের সঙ্গে তৃতীয় প্রধান নেতার আসনটি পেয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওয়াহেরলাল নেহরু। এটা ছিল পাকিস্তানের জন্য সরাসরি অপমান। একই জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের সদস্য হওয়ার জন্য পাকিস্তানকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল। এর মধ্য দিয়েও আইয়ুব খানের নীতি ও সিদ্ধান্তের ক্ষতিকর ভুলই প্রাধান্যে এসেছিল।
চতুর্থত, যুক্তরাষ্ট্রের কারণে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিল। পতনের একেবারে মুখোমুখি এসে বিষয়টি বুঝতে পেরেছিলেন আইয়ুব খান। সে কথাটাই তিনি তার আত্মজৈবনিক গ্রন্থ ‘ফ্রেন্ডস, নট মাস্টারস’-এ বলে গেছেন, ‘প্রভু নয় বন্ধু’ নামে যার বাংলা অনুবাদ বেরিয়েছিল (১৯৬৭)। এটা ১৯৬৫ সালে ভারতের কাছে যুদ্ধে হেরে যাওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতার আলোকে লিখেছিলেন আইয়ুব খান। তিনি একই সাথে ঝুঁকেছিলেন গণচীনের দিকে। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। নিজেকে তো রক্ষা করতে পারেনই-নি, পাকিস্তান রাষ্ট্রের ধ্বংসকেও অনিবার্য করে গিয়েছিলেন তিনি। তার পতনের দু’ বছরের মাথায় বাংলাদেশকে হাারিয়েছিল পাকিস্তান। বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানকে বুঝতে হয়েছিল, একটি মাত্র দেশের সেবাদাসগিরি করতে গিয়ে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ার পরিণতি কত ভয়ংকর হতে পারে। এদিক থেকে ভারত কিন্তু সকল বিষয়েই লাভবান হয়েছিল। পাকিস্তান যেখানে অস্ত্রশস্ত্রসহ প্রতিটি বিষয়ের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল ছিল, ভারত সেখানে রাশিয়াসহ সব দেশের কাছ থেকেই সাহায্য পেয়েছে। সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছিল বলেই ১৯৭১ সালে পাকিস্তানকে সশস্ত্র যুদ্ধে তো বটেই, কূটনৈতিক যুদ্ধেও ভারত পরাজিত করতে পেরেছিল। পাকিস্তানের পক্ষে কোনো রাষ্ট্রই দাঁড়ায়নি, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রও জাতিসংঘের ভেতরেই কেবল লোক দেখানো তৎপরতা চালিয়েছিল।
পাঠকরা সম্ভবত আইয়ুব খান সম্পর্কে এত কথা বলার কারণ বুঝতে পেরেছেন। বর্তমান বাংলাদেশও সেকালের পাকিস্তানের পরিণতির দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে কি না সে প্রশ্ন এখন যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গেই আলোচিত হচ্ছে। প্রসঙ্গক্রমে আইয়ুব খানের অন্য এক ঐতিহাসিক ‘কীর্তি’ সম্পর্কে বলা দরকার। সেটা তার বিখ্যাত আবিষ্কার ‘মৌলিক গণতন্ত্র’। আইয়ুব খান মনে করতেন, পাকিস্তানের জনগণ গণতন্ত্রের জন্য উপযুক্ত নয়, তারা এমনকি ভোট দেয়ারও অধিকার পেতে পারে না। এ চিন্তা ও বিশ্বাস থেকেই তিনি ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলেন। এ ব্যবস্থায় জনগণ শুধু স্থানীয় সরকার তথা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেই ভোট দিতে পারতো। এভাবে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে ৪০ হাজার করে ৮০ হাজার মৌলিক গণতন্ত্রী বা বিডি মেম্বার নির্বাচিত হতো। এরাই পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ এবং পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের দুই প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করতো। জাতীয় পরিষদ সদস্যদের এমএনএ আর প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যদের এমপিএ বলা হতো। ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ নামের উদ্ভট ব্যবস্থায় ভোটার তথা ৮০ হাজার মৌলিক গণতন্ত্রীকে সহজেই টাকার বিনিময়ে কেনা যেতো। কেনা হয়েছেও। ফলে গণতন্ত্রের সর্বনাশ তো হয়েছিলই, জনগণও হারিয়েছিল ভোটাধিকারসহ সকল অধিকার। এজন্যই আইয়ুব খানের আমলে প্রাপ্ত বয়ষ্কদের ভোটাধিকার দেয়ার দাবি সব সময় ছিল প্রধান একটি দাবি। আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফা, মওলানা ভাসানীর ১৪ দফা এবং সবশেষে ছাত্র সমাজের ১১ দফায়ও এর উল্লেখ ছিল। ক্ষমতা ছেড়ে যাওয়ার প্রাক্কালে আইয়ুব খান অবশ্য দাবিটি মেনে নেয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু আগেও বলা হয়েছে, ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল।
বর্তমান পর্যায়ে হঠাৎ আইয়ুব খানকে টেনে আনার অন্তত একটি কারণ সম্পর্কে জানিয়ে রাখা দরকার। সে কারণটি হলো, এরই মধ্যে হাওয়ায় এই মর্মে গুঞ্জন ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে যে, আগামী ডিসেম্বরে জেলা পরিষদের যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে সে নির্বাচনে নাকি কেবল তারাই ভোট দিতে পারবেন যারা এখন এবারের ইউপি নির্বাচনে মেম্বার বা চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হচ্ছেন। ইউপি নির্বাচন কেমন হচ্ছে সে সম্পর্কে নিশ্চয়ই কথা বাড়ানোর দরকার পড়ে না। এ প্রসঙ্গে বরং সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন-এর বক্তব্য উল্লেখ করা যায়। ইউপি নির্বাচনের দৃশ্যপট ও শিক্ষণীয় শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে সুজন-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, প্রথম ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন ছিল ‘বিকৃত’ নির্বাচন। ‘বিকৃত’ এই নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে হত্যা করা হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। প্রশ্ন তুলে বলেছেন, প্রশাসন ব্যর্থ হলে নির্বাচন কমিশনের ব্যবস্থা নেয়ার কথা। কিন্তু কমিশন ব্যর্থ হলে তাদের বিরুদ্ধে কে ব্যবস্থা নেবে?
নির্বাচনকে ‘বিকৃত’ বলার কারণও ব্যাখ্যা করেছেন সুজন সম্পাদক। তিনটি প্রধান কারণের উল্লেখ করে তিনি বলেছেন- প্রথমত, এতদিন মনোনয়ন বাণিজ্য হতো ওপরের তলায় কিন্তু এবারের নির্বাচনে মনোনয়ন বাণিজ্য ছড়িয়ে পড়েছে তৃণমূল পর্যায়ে। দ্বিতীয়ত, এবারের নির্বাচনে যে সহিংসতা হয়েছে ও হওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে তা অতীতের সকল নির্বাচনী সহিংসতাকে ছাড়িয়ে যাবে। আগে সহিংসতা সাধারণত নির্বাচনের দিন হতো, কিন্তু এবার নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পরও হচ্ছে। ফলে সহিংসতা হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদী। তাছাড়া সহিংসতা বেশি দেখা গেছে ক্ষমতাসীনদের মধ্যে। নির্বাচনকে ‘বিকৃত’ বলার তৃতীয় কারণ হলো, আগের মতো এবারের নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হয়নি। নির্বাচন বরং ছিল প্রায় প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন। এভাবে সব মিলিয়ে প্রথম ধাপের নির্বাচনকে ‘বিকৃত’ নির্বাচন বলাটাই স্বাভাবিক। 
বস্তুত সহিংসতার মাধ্যমে শুধু নয়, অন্য অনেক পন্থায়ও চলমান ইউপি নির্বাচনকে ‘বিকৃত’ করা হয়েছে। কারণ, সুজন-এর পক্ষ থেকে প্রথম ধাপের কথা বলা হলেও বাস্তবে শেষ ধাপের সময় ঘনিয়ে এলেও এখন পর্যন্ত অনেক এলাকায় বিএনপির প্রার্থীদের তো বটেই, এমনকি আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য বিদ্রোহী প্রার্থীদেরকেও ভয়-ভীতি দেখিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিতে বাধা দেয়া হয়েছে। তাদের মনোনয়নপত্র ছিঁড়ে ফেলেছে ক্ষমতাসীন দলের গুন্ডা-সন্ত্রাসীরা। বহু এলাকায় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করতে বাধ্য করা হয়েছে। যাচাই-বাছাই করার সময়ও ভুল থাকার যুক্তি দেখিয়ে অনেকের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এমন এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছে, যার ফলে প্রায় কোনো ইউনিয়নেই বিএনপির কোনো প্রার্থী দাঁড়াতে পারেননি। অন্যদিকে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত বলে ঘোষিত হচ্ছে কেবল আওয়ামী লীগের লোকজন। ঘটনাপ্রবাহে সবচেয়ে লক্ষণীয় হিসেবে এসেছে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা। কোনো একটি এলাকাতেই অনিয়ম ও সহিংসতার ব্যাপারে কমিশনকে কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। এজন্যই সুজন প্রশ্ন তুলেছে, প্রশাসন ব্যর্থ হলে নির্বাচন কমিশন ব্যবস্থা নিতে পারে বলে আইন রয়েছে কিন্তু কমিশন ব্যর্থ হলে তাদের বিরুদ্ধে কে এবং কিভাবে ব্যবস্থা নেবে?
সুজন-এর বক্তব্য ও জিজ্ঞাসাকে যথার্থ না বলে পারা যায় না। কারণ, যে কোনো দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন গণতন্ত্রের প্রথম ধাপ হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। আর ইউনিয়ন পরিষদের মতো তৃণমূল পর্যায়ের নির্বাচন হচ্ছে প্রথম ধাপেরও প্রথম ধাপ। অন্যদিকে বাংলাদেশে এবারের ইউপি নির্বাচনে সমগ্র সে প্রক্রিয়াকেই বিকৃত করা হয়েছে। এতে বিএনপিসহ কোনো বিরোধী দলই বাধাহীনভাবে অংশ নেয়ার সুযোগ পায়নি। আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরাও একই অবস্থার শিকার হয়েছেন। প্রতিটি ক্ষেত্রে অনিয়ম এবং বলপ্রয়োগের ঘটনা ঘটেছে প্রকাশ্যে। সরকার বিরোধী অনেককে আহত হওয়ার পাশাপাশি জীবনও হারাতে হয়েছে। এমন অবস্থায় জনমনে শুধু ভীতি-আতংকই ছড়িয়ে পড়েনি, জনগণ একই সাথে নির্বাচনের ব্যাপারেও আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। তারা আস্থা হারিয়েছে নির্বাচন কমিশনের ওপরও। জনগণের বুঝতে অসুবিধা হয়নি, কমিশন আসলে সরকারের সেবাদাসের ভূমিকাই পালন করেছে। আপত্তি হয়তো উঠতো না যদি কমিশনের এ ধরনের ভূমিকা কয়েকটি মাত্র এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকতো। অন্যদিকে প্রতিটি এলাকাতেই কমিশনকে একই ভূমিকায় দেখা গেছে।
বিষয়টি অবশ্যই গুরুতর। কারণ, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নামে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি আয়োজিত কর্মকাণ্ডের সময়ও বর্তমান কমিশনকে একই ন্যক্কারজনক ভূমিকায় দেখা গিয়েছিল। তিনশ আসনের মধ্যে ১৫৪টিতে আওয়ামী লীগ ও তার জোটের প্রার্থীরা বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হলেও এবং পুরো বিষয়টি দিবালোকের মতো পরিষ্কার হিসেবে সামনে চলে এলেও নির্বাচন কমিশনকে তৎপর হতে বা সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। উদ্বেগের কারণ হলো, বর্তমানে অনুষ্ঠিত হতে থাকা ইউপি নির্বাচনেও সংসদ নির্বাচনের ধারাবাহিকতাই লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না, প্রতিটি ধাপের নির্বাচনেই প্রথম ধাপের পুনরাবৃত্তি দেখতে হবে। দেখতে হচ্ছেও। এর ফলে পুরো নির্বাচন ব্যবস্থার ওপরই জনগণ আস্থা হারিয়ে ফেলবে। একই কারণে বাধাগ্রস্ত হবে গণতন্ত্র- যে বিষয়ে আশংকা প্রকাশ করতে গিয়ে সুজন-এর পক্ষ থেকে যথার্থই বলা হয়েছে, ‘বিকৃত’ এই নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে হত্যা করা হচ্ছে। আর এ ধরনের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যারা ‘জনপ্রতিনিধি’ হিসেবে নির্বাচিত হবেন তাদের নৈতিকতা ও জনগণের প্রতি দায়িত্বের বিষয়ে সংশয় থাকবে স্বাভাবিকভাবেই।
উদ্বেগের কারণ হলো, তথাকথিত এই জনপ্রতিনিধিরাই নাকি আগামীতে জনগণের পক্ষে সকল পর্যায়ে ভোট দেবেন! ডিসেম্বরে জেলা পরিষদ নির্বাচনে নাকি তারই প্রথম মহড়া হবে! বলা হচ্ছে, এর মধ্য দিয়ে আসলে আইয়ুব খানের সেই ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ ব্যবস্থা প্রবর্তনের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু হবে। এরপর আসবে সংসদ নির্বাচনের পালা। এভাবেই নাকি সব কিছু চালানোর চেষ্টা করা হবে। আমরা অবশ্য এখনই অনুমাননির্ভর কোনো বিষয়ে মন্তব্য করতে চাই না। তা সত্ত্বেও আইয়ুব খানের অন্তত দুটি তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া দরকার। প্রথমত, কোনো একটি মাত্র রাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করা এবং সে রাষ্ট্রের পরামর্শ বা নির্দেশ মেনে চলার পরিণতি ভয়ংকর এবং ধ্বংসাত্মক হতে বাধ্য- তা সেটা যতো ‘বন্ধুরাষ্ট্র’ই হোক না কেন। আইয়ুব খানের দ্বিতীয় অভিজ্ঞতাটি ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ সংক্রান্ত। জনগণকে তাদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করে দলীয় লোকজনকে ‘নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি’ বানানোর এবং তাদের মাধ্যমে সকল স্তরে নির্বাচন নামের নাটক সাজানোর পরিণতি কতটা ভয়ংকর হতে পারে সেটাও দেখে যেতে হয়েছে আইয়ুব খানকে। আমাদের ধারণা, নিরাপদ ভবিষ্যতের স্বার্থে সময় থাকতেই সংশ্লিষ্টরা সতর্ক হবেন।
আশিকুল হামিদ 

মঙ্গলবার, ২৬ এপ্রিল, ২০১৬

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বনাম কবি রফিক আজাদ


বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কবি রফিক আজাদ ৭৫ বছর বয়সে গত ১২ মার্চ ঢাকার বিএসএমএমইউ হাসপাতালে ইন্তিকাল করেছেন। বাংলাদেশে তিনি প্রেম ও দ্রোহের কবি হিসেবে সমধিক খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। কবি হিসেবে তাকে চিনতাম ষাটের দশকের শেষ দিক থেকেই। তার সঙ্গে আমার পরিচয় ১৯৭২ সাল থেকে, লেখালেখি সূত্রেই। তখন থেকেই আমি দেশের সকল সংবাদপত্রে প্রবন্ধ, উপসম্পাদকীয়, ছোটগল্প, সাহিত্য সমালোচনা, বুক রিভিউ, শিল্প সমালোচনা, ফিচার প্রভৃতি বিষয়ে নিয়মিত লিখতে শুরু করেছি। সেই সুবাদে সমসাময়িক কবি সাহিত্যিক সাংবাদিকদের সঙ্গে আমার পরিচয় হতে শুরু করে তাদের মধ্যে অনেক সিনিয়র শিক্ষকরাও ছিলেন। কবি রফিক আজাদ রসিক মানুষ ছিলেন। ফলে তাকে ঘিরে সরস আড্ডা জমতো। আমিও ছিলাম তার সদস্য। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি এসে রফিক ভাই আমার নাম দিলেন ‘রোবোট সিদ্দিকী’। এত বিষয়ে এত কীভাবে লেখ? আমি হাসতাম। রফিক ভাইয়ের দেখাদেখি আরও অনেকেই তখন আমাকে ‘রোবোট সিদ্দিকী’ বলে ডাকতেন। শেষের প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় ধরে রফিক ভাই কোনোদিন আমার নাম ধরে ডেকেছেন বলে মনে করতে পারছি না। তখন তিনি আমাকে ডাকতেন ‘সহোদর’। এমন কি অন্যের কাছে আমার কুশলাদি জানতেও বলতেন, ‘আমার সহোদর কেমন আছে?’ এই রফিক আজাদ ১৯৭৩ সালে ‘ভাত দে হারামজাদা’ কবিতা লিখে শেখ মুজিব সরকারের কঠোর নিগ্রহের মুখোমুখি হয়েছিলেন।
রফিক ভাই যখন হাসপাতালের আইসিইউতে, তখন তাকে দেখতে যেতাম। দেখতাম দূর থেকে। কাচের দরোজার বাইরে দাঁড়িয়ে। কিন্তু একদিন দেখলাম রফিক ভাই বিছানায় বসা। আমি কাচের দরোজার বাইরে। আমাকে দেখে চিনতে পারলেন। একটি হাত তুলে আকুল হয়ে ইশারায় ডাকতে থাকলেন, ডাক্তার ভেতরে যেতে দিলেন না। আমি অশ্রুসিক্ত নয়নে চোখ মুছতে মুছতে ফিরে এলাম। তারপর আর তাকে চোখ খোলা দেখিনি। চলে গেছেন রফিক ভাই। আল্লাহ তার সকল অপরাধ ক্ষমা করে তাকে বেহেশত নসিব করুন।
রফিক ভাই কাদেরিয়া বাহিনীতে যোগ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। এক হাতে কলম। আর এক হাতে রাইফেল। এই ছিল রণাঙ্গনে রফিক আজাদ। আমি কাদের সিদ্দিকীর একজন নিয়মিত পাঠক। তার নিয়মিত দর্শকও ছিলাম। যদিও তার রাজনীতির সঙ্গে আমি বহু ক্ষেত্রে দ্বিমত পোষণ করি। তবে কবি রফিক আজাদ  সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করে বঙ্গবীর আবদুল কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম লিখেছেন, ‘একজন মুক্তিযোদ্ধা কবি হিসেবে, প্রত্যক্ষ রণাঙ্গনের কবি হিসেবে তার যতটুকু স্বাধীন দেশে জায়গা পাওয়ার কথা ছিল তা তিনি পাননি। বঞ্চনা আর অবহেলা ছাড়া মনে হয় স্বাধীন দেশে মুক্তিযোদ্ধার পাওয়ার মতো আর কিছু নেই। তিনি গত শনিবার ইহজগৎ থেকে বিদায় নিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধে এক শনিবারে সখিপুরের মহানন্দপুরে কবির সঙ্গে আমার দেখা। টাঙ্গাইলের মানুষ হিসেবে অনেক আগে থেকেই তাকে জানতাম চিনতাম। কবি রফিক আজাদ, সাযযাদ কাদির, মাহবুব সাদিক, বুলবুল খান মাহবুব, কবি আবু কায়সার এরা সবাই আমার পরিচিত এবং রণাঙ্গনের সাথী। মুক্তিযুদ্ধে অনেক কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক জড়িত ছিলেন। কিন্তু কবি রফিক আজাদের মতো প্রত্যক্ষ রণাঙ্গনে কামানের গর্জন শুনে এক হাতে রাইফেল নিয়ে অন্য হাতে কলম কেউ চালাননি।...অনেক কবি-সাহিত্যিকের অগ্নিঝরা লিখনী মুক্তিযুদ্ধে অভাবনীয় অবদান রেখেছে। কিন্তু কবি রফিক আজাদ, বুলবুল খান মাহবুব, সাযযাদ কাদির, মাহবুব সাদিক এরা ছিলেন একেবারেই ভিন্ন। এদের এক হাতে ছিল কলম, অন্য হাতে রাইফেল, স্টেনগান, মেশিনগান।’
কাদের সিদ্দিকী লিখেছেন, ‘একদিন এক রাজনৈতিক সভা করে দুপুরে কাঞ্চনপুর হয়ে ফিরছিলাম। সঙ্গে ৩-৪টা গাড়ি। কোথাও গেলে এখনো রাস্তার দুই পাশে কখনো বেশি কখনো কম লোকজন দাঁড়ায়। সেদিন এক বাড়ির দেউড়ি বেড়ায় কয়েকজন ছেলেমেয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। একটা ছোট্ট উদাম বেশ নাদুসনুদুস বাচ্চা তার মাকে ঠেলা দিচ্ছিল, ‘ওই মা, মা, ভাত দিলি না? পেটে যে আগুন ধরছে। পুইড়া গেল। মা ভাত দে।’ বাচ্চার আপন মনে মায়ের কাপড় টেনে বারবার বলা কথা আমার কানে লাগে। সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ছিল ’৭৩ এ কবি রফিক আজাদের ‘ভাত দে হারামজাদা’ কবিতার কথা। তখন সারা দেশে এক অস্থিতিশীল অবস্থা। পাকিস্তানি হানাদাররা আমাদের কাছে নিদারুণভাবে হেরেছিল। ... যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশে অভাব তো ছিলই, পাটের গুদামে আগুন, কলকারখানা ধ্বংস, আওয়ামী লীগ নেতাদের গুপ্তহত্যা- এর মধ্যে কবি রফিক আজাদ একদিন লিখে বসলেন ‘ভাত দে হারামজাদা’। তখন বাংলাদেশ বেতার আর বিটিভি ছাড়া তেমন প্রচার মাধ্যম ছিল না। পত্রিকা ছিল বেশ কয়েকটি। পত্রিকাতে ফলাও করে ছাপা হয়, বিবিসি প্রচার করে এসব দেখেশুনে আমিও কিছুটা কষ্ট পাচ্ছিলাম। স্বাধীনতার পর কবি রফিক আজাদ আমার প্রাণ ছুঁয়ে ছিলেন। রফিক আজাদ মুক্তিযুদ্ধের কবি, স্বাধীনতার কবি, খেটে খাওয়া মানুষের ভালোবাসার কবি। তিনি রণাঙ্গনে যেমন কলম ধরেছেন, তেমনি রাইফেলও ধরেছেন। আমি তাকে অস্ত্র ধরা শিখিয়েছি। তাই বুকের মধ্যে তার জায়গা ছিল অনেক। ‘ভাত দে হারামজাদা’ লেখার জন্য কবি রফিক আজাদের জেল হয়েছে, হুলিয়া জারি হয়েছে। এক সকালে উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটে এসে দু’পা জড়িয়ে ধরে আকুল হয়ে বলেন, ‘স্যার আমারে বাঁচান। আমার যে জেল হয়ে গেছে। জেলখানা আমার ভালো লাগবে না। আমি কবি মানুষ জেলখানায় বসে বসে কী করব?’
কাদের সিদ্দিকী লিখেছেন, ‘রফিক আজাদ কখনো আস্তে কথা বলতে পারত না। তার কথা দূর থেকে শোনা যেত। মা রফিক আজাদকে সন্তানের মতো ভালোবাসতেন। বাবর রোডের ছোট্ট বাড়ি, কবি রফিক আজাদের কণ্ঠস্বর তার কানে যেতে সময় লাগেনি। বৈঠকখানায় এসে রফিক আজাদকে আমার পা ধরে থাকতে দেখে নিজ হাতে কবিকে টেনে তুলে শোফায় বসিয়ে জিজ্ঞেস করেন, ‘কী হয়েছে? তোমার মুক্তিযুদ্ধের গুরু, তার কাছে কোনো কিছু বলতে হলে পা ধরতে হবে কেন? তুমি তার যোদ্ধা। তোমায় ছায়া দেওয়া তার দায়িত্ব। কোনো চিন্তা করো না। যে জন্য এসেছ শান্তভাবে বল। বজ্রের যা করার অবশ্যই করবে। কিন্তু তুমি বাবা বঙ্গবন্ধুকে এভাবে হারামজাদা বলতে গেলে কেন? এটা কিন্তু বাবা ভালো করোনি।’ মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘নাস্তা খেয়েছো?’ না সূচক উত্তর পেয়ে বললেন, হাতমুখ ধুয়ে নাস্তা খেয়ে নাও। যতক্ষণ এখানে আছো চিন্তার কিছু নেই। ঝাড়া দিয়ে কবি উঠলেন অনেকটা বিপ্লবী কবি কাজী নজরুলের মতো বাবরি দুলিয়ে। হাতমুখ ধুয়ে নাস্তা খেলেন। মনে হলো বেশ কিছুদিন শান্তি মতো খাবার খাননি... কবির নাস্তা খাওয়া শেষ হলে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘সত্যিই আপনি বঙ্গবন্ধুকে এত বড় গালি দিলেন? আমাকেও কি দিতে পারবেন?’ মনে হয় কবি যেন জ্বলে উঠলেন। জ্বলবারই কথা, পেটে দানা-পানি পড়লে, নিজেকে নিরাপদ বোধ করলে তখন আর কবিদের হীনম্মন্যতা থাকে না। স্বরূপে তারা বেরিয়ে আসে। কবি বললেন, কোথায় বঙ্গবন্ধুকে গালি দিলাম? আমি শুধু আমার ক্ষুধার জ্বালার কথা বলেছি, মানুষের কথা বলেছি। গ্রামগঞ্জের বাচ্চারা মায়ের কাছে কীভাবে খাবার চায়। খুব ক্ষুধা লাগলে বলে না, মাগো ভাত দে, ভাত দিলি না, ভাত না দিলে তোরে খামু কিন্তু, বলে না?’ আঁতকে উঠে সম্বিত ফিরে পেলাম। সত্যিই তো কত জায়গায় কত বাচ্চার অমন কথা শুনেছি। আইয়ুব-মোনায়েমের আমলে বাবা-বড় ভাই যখন জেলে আমাদের পরিবার ভেঙে গুঁড়িয়ে তছনছ করে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। ক্ষুধার জ্বালায় আমি আমার ছোট ভাই বোনেরা কতবার মার কাছে অমন করে কান্নাকাটি করেছি, চিৎকার করেছি।’
কাদের সিদ্দিকীর ভাষায়, ‘কবি ৩-৪ বার ‘ভাত দে হারামজাদা’ পড়ে শুনালেন। ...কবি রফিক আজাদের ‘ভাত দে হারামজাদা’ শুনে আমি উত্তর পেয়ে গিয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল কবি তো মোটেই সরকারকে গালি দেয়নি, বঙ্গবন্ধুকে তো নয়ই। বরং বঙ্গবন্ধুকে কৃষ্ণ গহ্বরের দিকে যাওয়া থেকে ফেরানোর চেষ্টা করেছেন। উত্তেজনায় ঘেমে যাচ্ছিলাম। আমি সাধারণত অমন উত্তেজনাবোধ করি না। হানাদারদের মুখোমুখি হয়েও করিনি। সময় কাটতে চাচ্ছিল না। কবিকে বাড়িতে রেখে বিকালে গণভবন সুগন্ধায় গিয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধু আমাকে দেখেই বলছিলেন, ‘কি রে কাদের! তোর কবি রফিক আজাদ আমাকে অমন গালাগাল করছে কেন? সত্যিই কি আমি অমন কাজ করছি?’ বঙ্গবন্ধুর কথায় আমার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠেছিল। কতটা আঘাত পেলে কেউ অমন বলে। আমি বললাম, না। কবি আপনাকে গালাগাল করেনি। আপনাকে যথার্থ পিতার জায়গা দিয়ে বিপদ থেকে সতর্ক করতে চেয়েছে। ‘কী বলিস? অমনভাবে এই দুঃসময়ে আমাকে উদ্দেশ করে ভাত দে হারামজাদা বললো। তারপরও তুই বলছিস ও খারাপ বলেনি। কী বলিস?’
‘কবি আমায় যেভাবে যা বুঝিয়েছিলেন আমিও নেতাকে সেভাবে বুঝানোর চেষ্টা করলাম। এখন খেয়াল নেই হয় মোহাম্মদ আলী, না হয় ফরাসউদ্দিন কেউ একজন ছিলেন। কবিতাটি আনতে বললেন। আমি ২-৩টি জায়গা কয়েকবার পড়ে শুনালাম। পিতা তার আসন থেকে দাঁড়িয়ে গিয়ে আমার পিঠ চাপড়ে বললেন, ‘ঠিকই তো, তোর কবি ঠিক বলেছে, ঠিক লিখেছে। ওকে এখনই নিয়ে আয়।’ কবি আমার বাসাতেই ছিল। তাকে বঙ্গবন্ধুর কাছে নেওয়া কোনো কঠিন ছিল না। কিছুক্ষণ পরেই তাকে নিয়ে গেলাম পিতার কাছে। গিয়ে সালাম করার সঙ্গে সঙ্গে মাথার চুল ধরে টেনে তুলতে গিয়ে পিতা বললেন, ‘এই হারামজাদা, কবি হলেই এমন লেখে?’ কবি রফিক আজাদ বেশ মুখোর ছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, ‘এই যে আমার মাথার চুল ধরে টেনে তুলতে হারামজাদা বললেন, এটা কী? এটা কি ক্ষুুব্ধ হয়ে, নাকি ভালোবেসে বলেছেন?’ বঙ্গবন্ধু তব্দা ধরে বসে পড়লেন। কবি তার ‘ভাত দে হারামজাদা’ শুনালো ৪-৫ বার। পিতা অভিভূত হলেন। বুকে নিয়ে বারবার আদর করে বললেন, ‘তুই আরও লিখবি। এটাই তো কবিতা। মানুষের কথা তোরা না বললে কে বলবে?’ আমাকে বললেন, ‘কাদের, ওকে মাঝে মাঝে নিয়ে আসবি। ও আমাকে কবিতা শুনাবে। কবিতা শুনলে মন পরিষ্কার হয়।’ সঙ্গে সঙ্গে মনসুর ভাই, না মালেক ভাই কে যেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন, বললেন ‘ওর মামলা আমি তুলে নিলাম। আমি বেঁচে থাকতে ওর নামে যেন কোনো মামলা না হয়।’ এই ছিলেন বঙ্গবন্ধু।’  বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর এই লেখাটি বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ১৭ এপ্রিল, ২০১৬-তে।
কিন্তু বঙ্গবীর যা বললেন, তেমন কথা আমরা কখনও শুনিনি। কবি রফিক আজাদও বলেছেন ভিন্ন কথা। ২০১২ সালে তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, জাল পড়ার বিষয়টা সঠিক ছিল না। সঠিক ছিল না বমি খাওয়ার ছবিটাও। তবে সেটা দেখে তিনি কবিতাটা লিখেছিলেন। এই কবিতা নিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান এতটাই রুষ্ট হযেছিলেন যে, তার জেলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর ভেতরে বাইরে তার বিরোধী লোকে ভর্তি ছিল। আর দেশে পাকিস্তান তো পাগল হইয়া গিয়া তার যত লোক খুঁইজ্যা বাইর করছে টাকা পয়সা দিয়া। আর বঙ্গবন্ধুর মতো লোক বলে আমিও বাঁচ্চি। ওরা তো নিজেরা স্বপ্রণোদিত হইয়া অ্যারেস্ট অর্ডার বের কইরা ফেলছিল। কিন্তু আমার কমান্ডার আর সেকেন্ড-ইন-কমান্ড আনোয়ার হোসেন/ আনোয়ারুল হক শহীদ এই দুই জনে মিল্যা আমারে বঙ্গবন্ধুর কাছে নিয়া গেছে (কাদের সিদ্দিকী নিয়ে গেছেন, এমন কথা তিনি বলেননি।) যে এর কথা শোনেন। তখন রক্ষী বাহিনীর সেকেন্ড-ইন-কমান্ড ছিল আনোয়ারুল শহীদ। পরে আমি বলছি যে এই ঘটনা। তখন উনি টেলিফোন করে দিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে। ক্যাপ্টেন মনসুর আলীর কাছে আমারে পাঠাইলো যে, উহাকে পাঠাইলাম, যে গাড়িতে যাচ্ছে ওই গাড়িতে ফেরত দিবা। তো গাড়িতে গেলাম। উনি আমারে দেইখ্যা বললেন যে, বয়স কম, এখন তো এসবি করবি। এগুলা করলে সোজা আমার বাসায় চইলা আসবি। তখন ডিআইজিকে টেলিফোন কইরা দিল। এসবির যে অফিস। ঐখানে গেলাম। ওই তো আমারে আটকাইয়া রাইখ্যা বলল যে, কেন লিখছেন, কী, হেইডার ব্যাখ্যা লেখেন। এক দিস্তা কাগজ দিল আর দুই কাপ চা। বলল, চা খান আর লেখেন। ৬১ পৃষ্ঠা লিখছি। সারা পৃথিবীর যে খাদ্যাভাব, কোথায় কোথায় খাদ্যাভাব নাই, আছে, কোথায় কোথায় মানুষ মারা যাচ্ছে না খাইয়া, এগুলা তো কিছুই না। বললাম, আমি যা লিখছি ঠিক লিখছি। এইসব ইতিহাস পড়ার পরে যা দাঁড়ায়, এইটাও তাই। একটা মানুষও মারা যেতে পারে না। দেশ স্বাধীন হইছে, বঙ্গবন্ধুর উচিত ছিল এইডা দেখা। পরে আমারে কয় যে, যাও যাও।’
তাকে আটক রাখা হয়েছিল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেতরে পুলিশ কন্ট্রোল রুমে। আমরা অনেক তরুণ-প্রবীণ লেখক গেটের সামনে উদ্বিগ্ন হয়ে বসে ছিলাম। রফিক আজাদ বেরিয়ে এসেছিলেন এলোমেলো চুলে উদ্ভ্রান্তের মতো। আমরা আপাতত হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিলাম। তাই স্মৃতিচারণের ক্ষেত্রে আমাদের বোধকরি আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী 

শনিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০১৬

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

শফিক রেহমান এবং মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার পূর্বাপর


শফিক রেহমান কোনো গুরুত্বপূর্ণ জননেতা নন। বুদ্ধিজীবীদের মধ্যেও তিনি প্রথম কাতারের নন। তাকে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ জানে বাংলাদেশে ভ্যালেন্টাইন্স ডে’র প্রবক্তা হিসাবে। ভ্যালেন্টাইন্স ডে কে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ পছন্দ করে না। এর সাথে বাংলাদেশের সংস্কৃতির কোনো মিল নাই। বাংলাদেশের মানুষ বরং তাকে প্রেমের ব্যাপারী হিসাবেই জানে। তাও আবার বাংলাদেশের সব মানুষ না। কিছু উঠতি তরুণ-তরুণী, যারা তাদের অতীত ইতিহাস ও ঐতিহ্য বিস্মৃত অথবা তাদেরকে অতীত ইতিহাস ভুলানো হয়েছে, সেই মুষ্টিমেয় কতিপয় তথাকথিত ভালবাসার কাঙ্গালদের কাছেই বেশি পরিচিত। কিন্তু হঠাৎ করে অর্থাৎ এই মাসে বর্তমান সরকার তার মতো একজন নন পলিটিক্যাল এলিমেন্টের মাথায় রাজনীতির মুকুট পরিয়ে দিয়েছে। হঠাৎ করে ‘যায়যায় দিনের’ মীলা মঈনের অবৈধ প্রেম লীলার স্রষ্টা শফিক রেহমান এই মাসে খুব বিখ্যাত হয়েছেন। তাকে এমন বিখ্যাত করার জন্য বর্তমান সরকারকে ধন্যবাদ। মানুষ অপহরণ এবং হত্যা প্রচেষ্টার অভিযোগে এই ভালবাসার ফেরিওয়ালাকে গ্রেফতার করার সাথে সাথেই রাতারাতি তিনি একজন বড় রাজনৈতিক নেতার পর্যায়ে চলে গেছেন। ঠিক যেমন সজীব ওয়াজেদ জয় ইমরান সরকারের মতো তীব্র বিতর্কিত ব্যক্তিকে নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে নানান কথা বলে তাকে অকস্মাৎ সজীব ওয়াজেদ জয় প্রায় নিজের পর্যায়ে অর্থাৎ সমপর্যায়ে নিয়ে এসেছেন। শফিক রেহমানের বয়স ৮২ বছর। রাজনীতিতে তার সরব পদচারণা নাই। যেটুকু আছে সেটি একটি বাংলা দৈনিকের কল্যাণে। কারণ ঐ ব্যক্তিকে দিনের বেলা সকলের সামনে তাকে যেভাবে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং ৮২ বছর বয়স্ক একজন বৃদ্ধকে জেলে নিয়ে রিমান্ডে নেয়া হচ্ছে। তার ফলে মানুষের সহজাত সহানুভূতি তার ওপর পড়েছে এবং তার অতীতের প্রেমিক ইমেজ রাতারাতি একজন পলিটিক্যাল এলিমেন্টের ইমেজে রূপান্তরিত হয়েছে।
প্রিয় পাঠক, এখানে একটি বিষয় আমরা পরিষ্কার করে বলতে চাই। যেসব মামলায় শফিক রেহমানকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং দুই দফায় ১০ দিনের রিমান্ড দেয়া হয়েছে সেই ঘটনার টেকনিক্যাল দিক অথবা আইনগত দিক অথবা তার রাজনৈতিক দিক নিয়ে আমরা কোনো রকম মন্তব্য করছি না। একজন সাচ্চা গণতন্ত্রী হিসাবে আমাদের বক্তব্য হলো এই, শুধু শফিক রেহমান নন, সকলের ক্ষেত্রেই আইন তার নিজস্ব পথে এগিয়ে যাবে। সে ব্যাপারে কোনোরূপ মন্তব্য করা বা কোনো রকম হস্তক্ষেপ করা আমাদের মোটেই ইচ্ছা নাই। এজন্য আমরা এই কয়েকদিন এ ব্যাপারে নিজ থেকে কোনো মন্তব্য করি নাই। আজও করার কোনো ইচ্ছা নাই। কিন্তু আমরা দেখছি যে, বিষয়টি কেন যেন ক্রমান্বয়েই জট পাকিয়ে যাচ্ছে। বিষয়টি যেভাবে শুরু হয়েছিল এখন ঠিক সেই রকম নাই। মনে হচ্ছে মাঝখানে পথভ্রষ্ট হয়ে সেটি অন্যদিকে চলে যাচ্ছে। কারণ একই সময় দু’টো সাধারণ ঘটনা ঘটেছে। যেগুলো স্বাভাবিকভাবে সম্পন্ন হয়নি। তাছাড়াও এমন খাপছাড়াভাবে খবরটি প্রকাশিত হয়েছে যে, অনেকেই মূল বিষয়টি ধরতেই পারেননি। সেই জন্য আজ আমরা কোনো নিজস্ব মন্তব্য না করে এসব ঘটনাকে ক্রম অনুসারে সাজিয়ে নিচে পরিবেশন করছি। এর ফলে আর কিছু হোক বা না হউক, সাধারণ মানুষ একটা ঘটনার সৃষ্টি এবং ডাল পালা বিস্তার সম্পর্কে জানতে পারবে।
এই ঘটনার সাথে জড়িত হয়েছে ৩টি স্থান। একটি হলো আমেরিকা, আরেকটি হলো আমেরিকার আইন ও আদালত এবং তৃতীয় হলো আমেরিকার ল’ এবং জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট। পক্ষান্তরে বাংলাদেশ এন্ডে প্রধান অকুস্থল হলো বিএনপি ও জাসাস অফিস এবং শফিক রেহমানের বাস ভবন। ঘটনাবলী ধারাবাহিকভাবে এবং একটির সাথে আরেকটি জোড়া দিয়ে পরিবেশন করলে নিম্নোক্ত রূপ ধারণ করে।
॥দুই॥
২০১৫ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশের পল্টন থানায় একটি মামলা দায়ের হয়। যিনি মামলা দায়ের করেন তার নাম ফজলুর রহমান। তিনি ডিটেক্টিভ ব্রাঞ্চের একজন ইন্সপেক্টর। তিনি বিএনপির সাংস্কৃতিক অঙ্গ সংগঠন জাসাসের ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ উল্লাহ মামুন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় যে, তিনি প্রধান মন্ত্রীর পুত্র এবং তার তথ্য উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়কে অপহরণ ও হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিলেন। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, মোহাম্মদ উল্লাহ মামুনের পুত্র রিজভী আহমেদ সিজার আমেরিকায় একটি মামলায় জেল খাটছেন। পল্টন থানার ঐ মামলায় মোহাম্মদ উল্লাহ মামুনকে এই অপহরণ এবং হত্যা প্রচেষ্টায় সহযোগিতা করেছেন জনাব শফিক রেহমান এবং দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক এবং বেগম জিয়ার আমলের জ¦ালানি উপমন্ত্রী জনাব মাহমুদুর রহমান। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, জনাব মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে সরকার অসংখ্য মামলা দিয়েছে। ২০১৩ সালে মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়। সেই থেকে ৩ বছর তিনি জেলের ঘানি টানছেন। তিনি প্রতিটি মামলাই আইনগতভাবে লড়ে যাচ্ছেন। সরকারের নানান ভয় ভীতির কাছে তিনি নতি স্বীকার করেননি। চলতি মাসের গোড়ার দিকে মাহমুদুর রহমান তার বিরুদ্ধে জারিকৃত প্রতিটি মামলাতেই জামিন পান। বাংলাদেশের উচ্চ আদালত এসব মামলায় তাকে জামিন দেন। সব মামলায় জামিন পেয়ে যেদিন মাহমুদুর রহমান কারাগার থেকে বের হওয়ার জন্য শারীরিক ভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন এবং যখন তাকে বরণ করার জন্য কারাগারের বাইরে তার আত্মীয়-স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীরা পুষ্প গুচ্ছ নিয়ে অপেক্ষমাণ ছিলেন তখন তারা বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো শুনলেন যে, মাহমুদুর রহমানকে আজ আর মুক্তি দেয়া হবে না। কারণ তাকে অপর একটি মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে জেল খানাতেই রাখা হচ্ছে। প্রথমে মানুষজন বিস্মিত হন। কারণ এতোদিন পর তার বিরুদ্ধে আবার নতুন মামলা? তবে ধীরে ধীরে অস্পষ্টতার চাদর সরে যেতে থাকে। জানা যায় যে, ২০১৫ সালের আগস্ট মাসে পল্টন থানায় ইন্সপেক্টর ফজলুর রহমান যে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দাখিল করেছেন সেই মামলায় শফিক রেহমানের সাথে চক্রান্তকারী হিসাবে মাহমুদুর রহমানের নামও জুড়ে দেওয়া হয়েছে। মামলায় বলা হয়েছে যে, মামুন এবং বিএনপি ও তার জোটের কয়েক জন শীর্ষ নেতা ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর মাসের পূর্বেই আমেরিকা ইংল্যান্ড এবং বাংলাদেশী জাসাসের পল্টন অফিসে একাধিক বৈঠক করেন। এসব বৈঠকের উদ্দেশ্য ছিল প্রধানমন্ত্রীর পুত্রকে অপহরণ ও হত্যা করা। এই গুরুতর অভিযোগের স্বপক্ষে পুলিশের হাতে কি প্রমাণ রয়েছে সেটি আজ পর্যন্ত পরিষ্কার নয়।
॥তিন॥
সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, মামলার বা অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে সজীব ওয়াজেদ জয়কে অপহরণ ও হত্যা করা। এটি হলো মামলার বা অভিযোগের এই প্রান্ত। এই মামলা বা অভিযোগের অপর প্রান্ত হলো আমেরিকা। সেখানে কিন্তু অপহরণ বা হত্যা প্রচেষ্টার সত্যতা মেলেনি। মার্কিন কোর্টে একটি মামলা হয়েছে এবং সেই মামলায় ২ জন বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী আমেরিকান এবং ১ জন এফবিআই এজেন্টের জেল হয়েছে। তারা যে অভিযোগে জেল খাটছেন সেখানেও কিন্তু অপহরণ বা হত্যা পরিকল্পনার অভিযোগ নাই। মার্কিন আদালতে যে অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপন করা হয়েছিল এবং যে অভিযোগের ভিত্তিতে তারা জেল খাটছেন সেটা হলো, ঘুষ প্রদান এবং ঘুষ খাওয়ার অভিযোগ। সেই মামলায় সজীব ওয়াজেদ জয়ের নামও নাই। তাকে বলা হয়েছে বাংলাদেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক। তাকে চিহ্নিত করা হয়েছে ১ নম্বর ব্যক্তি হিসাবে। তবে একথা ঠিক যে, মামলা এবং মার্কিন আদালতের রায়ের পুরোটা পড়লে বুঝতে কষ্ট হয় না যে, এই ১ নম্বর ব্যক্তি হলেন প্রধানমন্ত্রীর পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়।
২০১৪ সালের ১৭ অক্টোবর আমেরিকার বিচার বিভাগ (US Department of Justice) এই মামলার সংক্ষিপ্ত সার ব্যাখ্যা করেন। বলা হয়, ‘‘দক্ষিণ নিউ ইয়র্কের এটর্নি প্রীত ভারারা, বিচার বিভাগের অপরাধ শাখার এ্যাসিস্ট্যান্ট এটর্নি জেনারেল লেসলী ক্যাল্ড ওয়েল এবং বিচার বিভাগের মহাপরিদর্শক মাইকেল হরোউইটজ্ ঘোষণা করেন যে, জোনাথন থ্যালার এবং বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী রিজভী আহমেদ সিজার মার্কিন হোয়াইট ফেডারেল কোর্টে নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেছেন। অপরাধ বলতে তারা বুঝিয়েছেন ঘুষ দেওয়ার বিনিময়ে আদালতের নথিপত্র হস্তগত করা। তাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তোলা হয়েছিল সেই অভিযোগে বলা হয়েছে যে, প্রাক্তন এফবিআই এজেন্ট রবার্ট লাস্তিক নগদ অর্থের বিনিময়ে আলোচ্য ২ বাংলাদেশীর নিকট সরকারি গোপনীয় নথিপত্র বিক্রয় করেন। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে ২০১২ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত একদিকে লাস্তিক ও থেলার এবং অন্যদিকে বাংলাদেশী এই ২ ব্যক্তি টাকা পয়সার লেনদেন করেন। এসব মূল্যবান কাগজপত্র সংগ্রহের বিনিময়ে আলোচ্য ২ বাঙ্গালি মার্কিন এজেন্ট গণকে ৩০ থেকে ৪০ হাজার ডলার ঘুষ দেয়ার প্রস্তাব করেন। কোর্ট রিপোর্টে বলা হয় যে, এফবিআই এজেন্ট লাস্তিক এবং থেলার ১ হাজার ডলার পান। বাকি লেনদেনের খবর বিচার বিভাগের রায়ে পাওয়া যায় না।
টরন্টোর সাংবাদিক শহীদ ইসলাম বলেন যে, তিনি বেশ কিছুদিন ধরে এই মামলার ব্যাপক তদন্ত করছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত ঘুষ গ্রহণ ছাড়া অপহরণ বা হত্যাকাণ্ডের কোনো অভিযোগ বা ডকুমেন্টের হদিস তিনি পাননি।
‘দ্য ওয়ার’ মাগাজিনের রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, জয়কে হত্যার কোনো ষড়যন্ত্র যুক্তরাষ্ট্রে হয়নি, এমনকি তার শারীরিক কোনো ক্ষতি করার মোটিভেরও প্রমাণ পায়নি মার্কিন আদালত। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ডিক চেনি এই ম্যাগাজিনের মালিক। তিনি আমেরিকার প্রাক্তন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী এবং তেল ব্যবসার একজন দিকপাল। তার পত্রিকার খবরের সূত্র সাধারণত অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য হয়।
তবে জয় যুক্তরাষ্ট্রের এবং তার বাইরে কোথায় কোথায় কত পরিমাণ অর্থ সম্পদ জমা করেছেন সে বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে দেয়ার শর্তে প্রবাসী এক বিএনপি নেতার ছেলে একজন এফবিআই এজেন্টকে ঘুষ দিয়েছিলেন বলে আদালত প্রমাণ পেয়েছিল। এবং সেই ঘুষ দেয়ার প্রমাণের ভিত্তিতে ঘুষদাতাকে চার বছরের কারাদণ্ডও দিয়েছে আদালত।
কিন্তু এ ঘটনায় জয়কে হত্যার কোনো উদ্দেশ্য ছিল না বলে আদালত তার লেখা রায়ে বলেছে। ‘দ্য ওয়ার’ এর পক্ষ থেকে ডেভিড বার্গম্যান অনুসন্ধান করে আদালতের ডকুমেন্টগুলো সংগ্রহ করেছেন। যদিও রায় সংক্রান্ত বেশ কিছু ডকুমেন্ট মার্কিন জাস্টিস ডিপার্টমেন্টের ওয়েবসাইটেই রয়েছে। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ডেভিড বার্গম্যান প্রখ্যাত আইনজীবী ড. কামাল হোসেনের জামাতা এবং তার মেয়ে ব্যারিস্টার সারাহ হোসেনের স্বামী। ডেভিড বার্গম্যান ইতোমধ্যেই অনুসন্ধানের রিপোর্টের জন্য বাংলাদেশ এবং দেশের বাইরে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন।

শুক্রবার, ২২ এপ্রিল, ২০১৬

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

নির্বাচন এবং খুনের রাজনীতি


শিরোনাম দেখে পাঠকরা বিভ্রান্ত হতে পারেন। কিন্তু না, কথাটা বাংলাদেশে চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন প্রসঙ্গে বলা হয়নি। না বলার কারণ, এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে এত বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটেছে যে, খুন বলুন আর হত্যাকা-ই বলুন সবই এখন ডাল-ভাতের মতো সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। খুব বেশি আগ্রহী যারা, তারা বরং এখন খুনের ‘সেঞ্চুরির’ জন্য অপেক্ষা করছেন। একই কারণে বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে কথা বাড়ানোর দরকার পড়ে না। শিরোনামের কথাটা এসেছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্রনাথ মোদির একটি বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে। গত ৪ এপ্রিল থেকে ভারতের রাজ্য পশ্চিম বঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন শুরু হয়েছে। ছয় ধাপের এ নির্বাচন শেষ হবে আগামী ৩০ এপ্রিল। ওই নির্বাচনে দলের পক্ষে প্রচারণা চালাতে এসে গত ২১ এপ্রিল পশ্চিম বঙ্গের হাওড়ার এক জনসভায় মিস্টার মোদি বলেছেন, ‘নির্বাচনে যারা হারে তারাই খুনের রাজনীতি করে। কিন্তু নির্বাচনে সহিংসতা কাম্য নয়।’
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্রনাথ মোদির কথাটুকু শুনলে যে কারো মনে হতে পারে যেন পশ্চিম বঙ্গের বিধান সভা নির্বাচনে বাংলাদেশের মতোই ডজনে ডজনে মানুষের মৃত্যু ঘটছে। আহতও হচ্ছে শত শত মানুষ। অন্যদিকে প্রাপ্ত খবরে জানা গেছে, মারপিট, বুথ দখল এবং প্রতিপক্ষের লোকজনকে ভোটকেন্দ্র থেকে বের করে দেয়ার মতো ঘটনার সংখ্যা অনেক হলেও হত্যাকা- কিন্তু তেমন ঘটেনি। ২১ এপ্রিল পর্যন্ত মাত্তরই একজনের মৃত্যু হয়েছে। আর এতেই ক্ষুব্ধ হয়ে কঠোর মন্তব্য করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী। তিনি সেই সাথে ক্ষতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসকে খোঁচা দিয়ে বলেছেন, নির্বাচনে যারা হারে তারাই খুনের রাজনীতি করে। মূল কথায় মিস্টার মোদি বলতে চেয়েছেন, এবারের নির্বাচনে হেরে যাচ্ছে বলেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল খুনের রাজনীতি শুরু করেছে।
আসলেও কি তা-ই? মুখ্যমন্ত্রী মমতার দল তৃণমূল কংগ্রেস কি সত্যিই হেরে যাচ্ছে? প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ সন্দেহ নেই; কিন্তু তেমন কোনো জল্পনা-কল্পনায় যাওয়ার আগে অন্য কিছু কথা সেরে নেয়া দরকার। পশ্চিম বঙ্গের বিধান সভার এ নির্বাচনের সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে বাংলাদেশেও আলোচনা যথেষ্টই হচ্ছে। এর কারণ, পশ্চিম বঙ্গকে বাংলাদেশের প্রতি ‘সহানুভূতিশীল’ বলে প্রচার চালানো হয়Ñ যদিও সর্বশেষ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পর্যন্ত সকল ক্ষমতাসীনই বুঝিয়ে দিয়েছেন, তারা বাংলাদেশকে শুধু ব্যবহার করতে চান এবং পশ্চিম বঙ্গের কাছে বাংলাদেশের কিছুই পাওয়ার বা আশা করার নেই। তা সত্ত্বেও ‘এপার বাংলা-ওপার বাংলা’ বলে চামাচামো করার এবং কলকাতায় বৃষ্টি হলে ঢাকায় ছাতা ধরার মতো লোকজনের সংখ্যা এদেশে নিতান্ত কম নয়। সে প্রসঙ্গে যাওয়ার পরিবর্তে জানানো দরকার, ৩০ এপ্রিলের পর এদেশের কারো কারো ‘দিদিমনি’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাগ্য নির্ধারিত হবে। তার দল তৃণমূল কংগ্রেস আবারও ক্ষমতায় যেতে পারবে কি না সেটাও জানা যাবে। পাঠকরা লক্ষ্য করবেন, কথাটার মধ্যে সংশয়ের আভাস রয়েছে। কেন- তার একটি বড় কারণ হলো, ২০১১ সালের নির্বাচনে সোনিয়া গান্ধীর নেতৃত্বাধীন ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বেঁধে বিরাট বিজয় অর্জন করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এবার কিন্তু তার উল্টোটি ঘটেছে। কংগ্রেস জোট বেঁধেছে সেবার বিতাড়িত বামফ্রন্টের সঙ্গে। এ এক অচিন্ত্যনীয় ব্যাপারÑ যদিও ভারতের সুবিধাবাদী ও ক্ষমতালোভী রাজনীতিকদের জন্য এটাই স্বাভাবিক।
এদিকে এককালের তুখোড় বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে প্রচারের অভিযান তুঙ্গে উঠেছে। কংগ্রেস ও বামফ্রন্টের যৌথ উদ্যোগে এটা চলছে কয়েক মাস ধরে। ভারতীয় গণমাধ্যমের সাম্প্রতিক বিভিন্ন খবরেই এমন অবস্থার কারণ জানা যাচ্ছে। মমতা বিরোধী প্রচারণার সবচেয়ে বড় ইস্যু এখন ঘুষ ও অর্থ কেলেংকারিসহ সর্বব্যাপী দুর্নীতি। বলা হচ্ছে, ২০১১ সালের মে মাসে পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার আগে পর্যন্ত প্রায় ১১ বছর ধরে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতৃত্ব দেয়ার সময় এই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার ছিলেন। সাধারণ সুতি শাড়ি ও ঘরে পরার চপ্পল পরে গোটা রাজ্য ঘুরে বেড়িয়েছেন তিনি। শুধু নির্বাচনের আগের দিনগুলোতে নয়, তার আগের কয়েক বছর আগে থেকেই আর দশটা সাধারণ মানুষের মতো থেকেছেন তিনি। কমিউনিস্ট নামধারীদের মতো বাবুয়ানা ও ফুটানি করতে দেখা যায়নি তাকে। পশ্চিম বঙ্গের মানুষও তাই মমতাকে নিজেদের কাছের মানুষ হিসেবে গ্রহণ করেছিল। মমতা সবার ‘দিদি’ বা বোন হয়ে উঠেছিলেন। সেবারের নির্বাচনে দীর্ঘ ৩৪ বছর ধরে ক্ষমতাসীন কমিউনিস্টদের বামফ্রন্ট সরকারকে রীতিমতো ঝেঁটিয়ে বিদায় করেছিলেন মমতা। ওই নির্বাচনে সিপিএম তথা বামফ্রন্ট শুধু হেরে যায়নি, হেরেছিলও লজ্জাকরভাবে। মমতার তৃণমূল কংগ্রেস ও সোনিয়া গান্ধীর ন্যাশনাল কংগ্রেসের জোট যেখানে ২২৫টি আসন পেয়েছিল সেখানে বামফ্রন্টের প্রধান শরিক দল সিপিএম জিতেছিল মাত্র ৪১ আসনে। সব মিলিয়ে বামফ্রন্টের আসন হয়েছিল ৬১। সেটা ছিল একটি নির্বাচনী রেকর্ড। কেন এত বিরাট ব্যবধানে অমন পরাজয় ঘটেছিল, তার কারণ নিয়ে দেশে-বিদেশে যথেষ্ট অলোচনা হয়েছিল।
বামফ্রন্টের ভরাডুবি ও তৃণমূল কংগ্রেসের বিরাট বিজয়ের একটি বড় কারণ হিসেবে বহুদিন পর সেবার প্রাধান্যে এসেছিলেন নির্যাতিত ও বঞ্চিত মুসলমানরা। শতকরা হিসাবে প্রায় ২৫ শতাংশ ভোট থাকলেও পশ্চিম বঙ্গে তারা ‘সংখ্যালঘু’। সেবারের নির্বাচনে মুসলমানরাই নির্ধারকের ভূমিকা পালন করেছিলেন। সে কারণে মুসলমানদের ভোট পাওয়ার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অতি হাস্যকর প্রতিযোগিতা দেখা গিয়েছিল। মুসলমানদের উন্নতি-সমৃদ্ধির নানা ধরনের অঙ্গিকারের ঘোষণা দিয়েছিলেন তারা। প্রতিটি দলই কয়েকজন করে মুসলমান প্রার্থী দাঁড় করিয়েছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মাথায় ঘোমটা দিয়েছেন। পবিত্র কোরআন হাতে মুসলমানদের ‘দোয়া’ চেয়ে বেড়িয়েছেন তিনি। তৃণমূলের নারী কর্মীরা গায়ে বোরখা চাপিয়েছিলেন, পুরুষরা মাথায় টুপি পরেছিলেন। মুসলমানদের নিয়ে বামফ্রন্টকে ঠ্যালা-ধাক্কাও কম দেননি মমতা। মমতার এই ঠ্যালা-ধাক্কা খেয়ে ৩৪ বছর ক্ষমতায় থাকার পর নির্বাচনের প্রাক্কালে সিপিএম ও বামফ্রন্ট নেতারা ঘোষণা দিয়েছিলেন, আবার ক্ষমতায় এলে তারা মুসলমানদের জন্য শিক্ষা-চাকরি ও ব্যবসাসহ সকল ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ রিজার্ভেশন বা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করবেন। এমন ঘোষণার কারণ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বদৌলতে এই সত্য ফাঁস হয়ে পড়েছিল যে, জনসংখ্যার দিক থেকে প্রায় ২৫ শতাংশ হলেও বামফ্রন্ট সরকারের আমলে এক শতাংশ মুসলমানও শিক্ষা-চাকরি ও ব্যবসা পাননি। এতটাই ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ ও ‘প্রগতিশীল’ এই কমিউনিস্টরা! প্রমাণিত হয়েছিল, তৎকালীন কমিউনিস্ট মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যরাও মনে-প্রাণে কট্টর হিন্দুত্ববাদীর ভূমিকা পালন করে এসেছেন। স্মরণ করা দরকার, বামফ্রন্ট সরকারের আমলেই কলকাতাসহ পশ্চিম বঙ্গে মাইকে আযান দেয়া আইন করে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।
অন্যদিকে মমতা নিয়েছিলেন খুবই চাতুরিপূর্ণ কৌশল। বঞ্চিত ও নির্যাতিত মুসলমানদের জন্য তার ছিল অনেক প্রতিশ্রুতি। কমিউনিস্ট ও বামফ্রন্ট বিরোধী জনমত গঠন করার জন্য যেখানে যা কিছু বলা দরকার তার কোনো কিছুই বাদ দেননি এই বুদ্ধিমতী নেত্রী। কট্টর হিন্দু হওয়া সত্ত্বেও মুসলিম প্রধান এলাকায় যাওয়ার আগে তিনি পবিত্র কোরআন শরীফ হাতে নিয়েছেন, মুসলমান নারীদের মতো গায়ে ওড়না জড়িয়েছেন এবং মাথায় ঘোমটা দিয়েছেন। অর্থাৎ অশিক্ষিত ও স্বল্পশিক্ষিত মানুষকে পক্ষে টেনে আনার এবং বিভ্রান্ত করার জন্য সবই করেছিলেন তিনি। এতে কাজও হয়েছিল। নির্বাচনে অবিশ্বাস্য বিজয় অর্জন করেছিলেন তিনি। সে বিজয়ের পেছনে প্রধান ভূমিকা ছিল মুসলমান ভোটারদের। এসবের বাইরে এক বছরের মধ্যে ১০ লাখ বেকারকে চাকরি দেয়া, জেলায় জেলায় শিল্প-কারখানা স্থাপন এবং সাধারণ স্কুল-কলেজের পাশাপাশি মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ প্রতিষ্ঠার মতো অসংখ্য প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
বিধানসভার নতুন নির্বাচনকে সামনে রেখে তাই স্বাভাবিক নিয়মে হিসাব-নিকাশও শুরু হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর বিগত পাঁচ বছরে প্রতিশ্রুতি বা অঙ্গিকার কতটুকু পূরণ করেছেন মমতা, তা নিয়ে চলছে জোর পর্যালোচনা। এতে কিন্তু মমতা এগিয়ে থাকতে পারছেন না। কারণ, ৭২ লাখ বেকারকে চাকরি দিয়েছেন বলে ঘোষণা দিলেও কথাটার পক্ষে এ পর্যন্ত কোনো প্রমাণ হাজির করতে পারেননি মুখ্যমন্ত্রী মমতা। দুই টাকা কেজি দরে চাল খাওয়ানোর বিষয়টিও মিথ্যাচার হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে মুসলমান ‘সংখ্যালঘু’দের উন্নতি সম্পর্কে। বলা হচ্ছে, রমযান মাসে মুসলমানদের বাসাবাড়িতে ঘোমটা দিয়ে ইফতার খাওয়া ছাড়া এমন কিছুই তিনি করেননি, যার ফলে ২৫ শাতংশ মুমলমানের অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটবে। তাদের জন্য না তিনি চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করেছেন, না অন্য ভারতীয়দের মতো মুসলমানরা পেয়েছেন ব্যবসা ও শিক্ষার সুযোগ। অর্থাৎ মুসলমানরা যে তিমিরে ছিলেন সে তিমিরেই রয়ে গেছেন। মাঝখান দিয়ে মমতা বেশি সাফাই গাইতে গিয়ে বিপদ বাড়িয়েছেন মুসলমানদের। হিন্দুরা এখন ভয়ংকর সাম্প্রদায়িক হয়ে উঠেছে। ছোট-বড় দাঙ্গা থেকে অনেক ঘটনার ক্ষেত্রেই বিপন্ন হয়ে পড়ছেন তারা।
মুসলমানদের কথিত উন্নয়নের মতো অন্য সব ক্ষেত্রেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রতারণার অভিযোগেই বেশি অভিযুক্ত হতে হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে ঘুষ-দুর্নীতি ও অর্থ কেলেংকারির অসংখ্য বিষয়। নারদ স্টিং নামের অপারেশনে একের পর এক তৃণমূল মন্ত্রী ও নেতার ঘুষ নেয়ার ভিডিও বেরিয়ে এসেছে। এতে দেখা গেছে, তৃণমূলের মন্ত্রী ও নেতারা খুশি মুখে লাখ লাখ টাকার বান্ডিল হাতে নিচ্ছেন, কেউ তোয়োলেতে জড়িয়ে নিচ্ছেন কেউ আবার  নিয়ে আলমারিতে গুছিয়ে রাখছেন। প্রথমে অস্বীকার করলেও ইদানীং মমতা বলে বেড়াচ্ছেন, যদি কিছু ভুল হয়েই থাকে তাহলে ভোটাররা যেন ক্ষমা করে দেন। তাদের আশীর্বাদের হাত যেন তৃণমূলের ওপর থেকে সরিয়ে না নেন। এরপর এসেছে সারদা ও রোজভ্যালি নামের দুটি চিট ফান্ডের সঙ্গে কোটি কোটি টাকার লেনদেনের সচিত্র রিপোর্ট। সংস্থা দুটির কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে গোপন বৈঠক করতে স্বয়ং মমতা নাকি উত্তরবঙ্গের ডেলো ডাকবাংলোতে গিয়েছিলেন। সেখানে লেনদেনও হয়েছিল বিশাল অংকের। এসবের ভিডিও প্রকাশ করেছে মমতাবিরোধীরা। জনগণও তা বিশ্বাস করেছে। সবশেষে প্রাধান্যে এসেছে কলকাতার বাণিজ্যিক এলাকা বড় বাজারে নির্মাণাধীন একটি ফ্লাইওভার ধসে পড়ার এবং তার কারণে ২৭ জনের মৃত্যুর ঘটনা। এর সূত্র ধরে প্রমাণিত হয়েছে, তৃণমূল সরকারের আমলে যত নির্মাণের কাজ হয়েছে সেগুলোর প্রতিটিতেই নি¤œ মানের সামগ্রী ব্যবহার করেছে ঠিকাদাররা। কারণ, ঠিকাদাররা না চাইলেও তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের দোকান ও প্রতিষ্ঠান থেকে নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী কিনতে বাধ্য করা হয়েছে। এভাবে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে মমতার দল।
অর্থাৎ সবদিক থেকেই পিছিয়ে পড়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অন্যদিকে মমতার ব্যর্থতা এবং ঘুষ-দুর্নীতি ও অর্থ কেলেংকারির ঘটনাগুলোকে পুঁজি বানিয়েছে কংগ্রেস ও বামফ্রন্টের বিচিত্র জোট। তাই বলে বিশেষ করে সোনিয়া গান্ধীর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল  কংগ্রেসের আশা করার তেমন কিছু নেই। এর একটি কারণ, পশ্চিম বঙ্গে কংগ্রেস কখনোই জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেনি। ইন্দিরা গান্ধীর মতো ডাকসাঁইটে একজন প্রধানমন্ত্রীও কংগ্রেসকে জনগণের কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারেননি- এমনকি ‘এপার বাংলা’ বাংলাদেশকে স্বাধীন করে দেয়ার কৃতিত্ব দাবি করার পরও। পশ্চিম বঙ্গে কংগ্রেসের অবস্থা সম্পর্কে বোঝানোর জন্য একটি মাত্র তথ্যের উল্লেখ করাই যথেষ্ট। ১৯৮৪ সালে  প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তার দেহরক্ষীদের গুলিতে নিহত হওয়ার পর সমগ্র ভারতেই কংগ্রেসের পক্ষে জোয়ারের সৃষ্টি হয়েছিল। সব রাজ্যে বিরাট ব্যবধানে জিতলেও এবং কেন্দ্রে সরকার গঠন করতে পারলেও পশ্চিম বঙ্গে ‘বামেরাই’ জিতেছিলেন।
জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে সরকারও গঠন করেছিলেন তারাই।
এবারের নির্বাচনে কংগ্রেসের সম্ভাবনা না থাকার দ্বিতীয় কারণ হিসেবে রয়েছেন ভারতের বর্তমান রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়। এ পদটিতে মনোনয়ন পাওয়ার জন্যও ‘বাঙালী’ নেতা প্রণব মুখার্জিকে দীর্ঘ ৬৫ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। উল্লেখ্য, নামে রাষ্ট্রপ্রধান হলেও ভারতে রাষ্ট্রপতিকে আসলে অলংকারের মতো রাখা হয়। সব ক্ষমতা থাকে প্রধানমন্ত্রীর হাতে। আরেক ‘বাঙালী’ কমিউনিস্ট নেতা ও সাবেক মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু ব্যর্থ হওয়ার পর প্রণব মুখার্জি নিজেও বহুবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার চেষ্টা করে দেখেছেন। কিন্তু পারেননি। সবশেষে রাষ্ট্রপতি বানানোর নামে প্রণব মুখার্জিকে প্রধানমন্ত্রিত্বের রেস বা দৌড় থেকেই সুকৌশলে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। পর্যবেক্ষকরা সে সময় বলেছিলেন, ইন্দিরা গান্ধীর সময় থেকে গান্ধী পরিবারের অতি বিশ্বস্ত সেবক হিসেবে ভূমিকা পালন করে এলেও প্রণব মুখার্জি কংগ্রেসের জন্য ‘বার্ডেন’ তথা বোঝা হয়ে উঠেছিলেন। সোনিয়া গান্ধী না তাকে গিলতে পারছিলেন, না পারছিলেন উগলে ফেলতে। অনুকূল পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে এবং সুযোগ পেলেই প্রণব মুখার্জি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আবদার জানিয়ে বসছিলেন। ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখেও আরো একবার তৎপর হয়ে উঠেছিলেন তিনি। প্রণব মুখার্জির বিরুদ্ধে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং-বিরোধী তৎপরতা চালানোর অভিযোগও এসেছে।
তাছাড়া যতো বিশ্বস্ত সেবকই হোন না কেন, একদিকে তিনি ‘বাঙালী’ অন্যদিকে আবার চেষ্টা চলছিল রাজিব ও সোনিয়া গান্ধীর ছেলে রাহুল গান্ধীকে প্রধানমন্ত্রী বানানোর জন্য। সে কারণেই কংগ্রেসের ঘাড় থেকে প্রণব নামের বোঝাটিকে ঝেড়ে ফেলে দেয়ার প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। সেটাই করেছে কংগ্রেস। ২০১২ সালের ১৯ জুলাই অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রণব মুখার্জিকে রাষ্ট্রপতি বানানো হয়েছে। এই ‘বাঙালী’ নেতা যাতে এদিক-সেদিক করতে না পারেন সেজন্য স্বয়ং সোনিয়া গান্ধী তার নাম প্রস্তাব করেছিলেন। রাষ্ট্রপতি বানানোর মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে ভারতের রাজনীতি থেকেই প্রণব মুখার্জিকে বিদায় করেছেন সোনিয়া গান্ধী। এটা ছিল কংগ্রেসের জন্য সাময়িক বিজয়। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে কংগ্রেস একই সঙ্গে নস্যাৎ করেছিল পশ্চিম বঙ্গে দলটির সম্ভাবনাকেও। কারণ, সরকার গঠন করার মতো সাধ্য না থাকলেও রাজ্যে বহু বছর ধরে কংগ্রেসের রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিয়ে এসেছেন প্রণব মুখার্জি। সে তিনিই রাষ্ট্রপতি হয়ে যাওয়ার ফলে তার পক্ষে আর কংগ্রেস বা অন্য কোনো দলের জন্য কাজ করার বা প্রচারণা চালানোর সুযোগ নেই। অন্যদিকে প্রণব মুখার্জি ছাড়া দ্বিতীয় কোনো নেতাও পশ্চিম বঙ্গে এখনো তৈরি হননি, যিনি কংগ্রেসকে ক্ষমতার লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিতে পারবেন। 
কংগ্রেসের পাশাপাশি বামফ্রন্টের জন্যও এবারের বিধানসভা নির্বাচন আশাবাদী হওয়ার মতো কারণ এখনো সৃষ্টি করতে পারেনি। এর কারণ, দীর্ঘ ৩৪ বছর ক্ষমতায় থাকলেও কমিউনিস্টরা রাজ্যের জন্য কিছু করেননি। যা করেছেন সবই নিজেদের আখের গোছানোর জন্য। একই কারণে ২০১১ সালের নির্বাচনে মমতা তাদের ঝেঁটিয়ে বিদায় করতে পেরেছিলেন। তাছাড়া বিগত পাঁচ বছরেও সরকারের বিরুদ্ধে সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে প্রচারণা চালানো ছাড়া এমন কোনো কাজই বামফ্রন্ট করেনি, যার কারণে ভোটাররা আবারও কমিউনিস্টদের ক্ষমতায় আনবে। এখানে অবশ্য একটি কথা বলে রাখা দরকার। কথাটা মুসলমানদের সম্পর্কে। বলা হয়, পশ্চিম বঙ্গের নির্যাতিত ও বঞ্চিত মুসলমানরা নাকি কংগ্রেসের ভোটার। সে জন্যই তৃণমূল গতবার কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বেঁধেছিল, জিতেও গিয়েছিল। এবার কংগ্রেস যেহেতু বামফ্রন্টের সঙ্গে জোট বেঁধেছে সেহেতু মুসলমানদের ভোটও তারা পেয়ে যেতে পারে। তেমনটি ঘটলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিপর্যয়ের কবলে পড়তে হবে। তা সত্ত্বেও সব মিলিয়ে বলে রাখা যায়, পশ্চিম বঙ্গের ভোটার জনগণ এবারই সম্ভবত মমতার ওপর থেকে ‘আশীর্বাদের হাত’ উঠিয়ে নেবে না। একেবারে বিমুখ করবে না তৃণমূল কংগ্রেসকে। অর্থাৎ স্বল্প ভোটের ব্যবধানে হলেও মমতাই আবার মুখ্যমন্ত্রী হতে পারেন। সে ক্ষেত্রে দায়ী থাকবে ২০১১ সাল পর্যন্ত টানা ৩৪ বছর ক্ষমতায় থাকা বামফ্রন্ট তথা কমিউনিস্টরা। তাছাড়া কংগ্রেসের সুবিধাবাদী রাজনীতিকেও জনগণ ভালো চোখে দেখছে না। এরই সুফল পেয়ে যেতে পারেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
আশিকুল হামিদ 

বৃহস্পতিবার, ২১ এপ্রিল, ২০১৬

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

সাংস্কৃতিক আগ্রাসনই বর্তমান প্রজন্মের জন্য বড় হুমকি!


আজকাল অনেকেরই সময় কাটে খুব টেনশনে। ছেলে বা মেয়ের চিন্তা করে ঘুম আসে না। রাত বাড়তে থাকে, সাথে সাথে বাবা মায়ের চিন্তার পরিধি, ব্যাপকতা এবং ভয়াবহতাও বাড়তে থাকে। ওদিকে যাদের জন্য বাবা মায়ের ঘুম হারাম তারা কিন্তু অপসংস্কৃতির ঘৃণ্য থাবা থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না। বেরিয়ে আসার পরিবেশটা পাচ্ছে কি না সেটাও প্রশ্ন সাপেক্ষ ব্যাপার। দেশে অনেক কিছু হচ্ছে এবং ঘটছে। এত কিছুর ভীড়ে সবাই কেমন যেন আমাদের সংস্কৃতি, বিশ্বাস যে উচ্ছনে চলেছে তা বেমালুম গোচর করছেন না। ফলে সাংস্কৃতিক লুটেরা এবং দুর্বৃত্তরা তাদের ফায়দাটুকু ঠিক ঠিক লুটে নিচ্ছে। আমাদের দেশের শাসক এবং অভিভাবকগণ যখন অবচেতন মনে সংস্কৃতির বিষয়টিকে এড়িয়ে চলেছেন ঠিক তখনি এ সুযোগটা কাজে লাগাতে কালক্ষেপণ করছেনা ভীনদেশী সংস্কৃতির তল্পীবাহকরা। অবশ্য বর্তমান সাংস্কৃতিক পরিবেশকে অনেক বাবা মা স্বাগতম জানিয়েছেন এবং ছেলে মেয়ের প্রগতিশীল আচরণ শেখার নাম করে বিপথে যাবার পথটাকে সুগম করছেন। এখন অনেক পরিবারে নিজস্ব সংস্কৃতির তালীম হয় না, হয় ধার করা বিজাতীয় সংস্কৃতির আল্ট্রামডার্ন তালীম যা কি না পরবর্তীতে ঐশীদের জন্ম দেয়। খ্যাতিমান ছড়াশিল্পী অজয় দাশ গুপ্ত তার এক ছড়ায় লিখেছিলেন সংস্কৃতি মানে যদি প্রিন্সেস নাচা/দেশ তবে দেশ নয়, বানরের খাঁচা। বহুদিন আগে লেখা তার এ ছড়ায় বাঙালি সংস্কৃতির যে দৈন্যদশা মাত্র দুটি লাইনে প্রকাশিত হয়েছে এক কথায় তা অপূর্ব। বর্তমান প্রজন্ম কবে এ বানরের খাঁচা থেকে মুক্ত হবে তা এ সময়ের বড় প্রশ্ন। আমাদের সংস্কৃতি প্রবলভাবে সা¤্রাজ্যবাদী আর সম্প্রসারণবাদী সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শিকার। এক সময় আমরা পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে নিজস্ব সংস্কৃতি সম্পর্কে থেকেছি বেখেয়াল। এখন নতুন করে মুখোমুখি আরেক সম্প্রসারণবাদী সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের। সময়ের সাথে এই আগ্রাসন ক্রমেই পরিব্যাপক হচ্ছে। এই আগ্রাসনের সহজ শিকার আমাদের তরুণ প্রজন্ম। কোনো ধরনের ভালো-মন্দ বিবেচনা না করেই এরা অন্ধভাবে অনুকরণ করছে এমন বিদেশী সংস্কৃতি, যার পরিণাম ভয়াবহ। এর অনিবার্য পরিণাম নিজস্ব সংস্কৃতিকে অস্থিত্বহীনতার দিকে ঠেলে দেয়া। সম্প্রসারণবাদীদের চাওয়াটা কিন্তু তাই। কারণ, এরা ভালো করে জানে একটি জাতিকে পদানত করতে সবার আগে প্রয়োজন এর শিক্ষা-সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে দেয়া। নিজস্ব সংস্কৃতি থেকে তরুণ প্রজন্মকে বিচ্ছিন্ন করা। সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ‘আগ্রাসন’ শব্দটি যথাযথ কিনা তা তর্ক সাপেক্ষ। তবে যেটা বাস্তব তা হলো- ‘তোমার পছন্দের ওপরে আমার পছন্দকে কৌশলগতভাবে এমনভাবে চাপিয়ে দেবো যাতে তুমি পর্যায়ক্রমে তাতে প্রভাবিত হও এবং একসময় আমার পছন্দকে গ্রহণ করো। এটা একটা দিক।’ দ্বিতীয় বিষয় হলো যুব এবং তরুণ সম্প্রদায়ের শিক্ষা মাধ্যমে এমন কিছু বিষয় সংযুক্ত করবো এবং এমন কিছু বিষয় কৌশলে বাতিল করবো যাতে তাদের চিন্তাধারার পরিবর্তন সাধিত হয় এবং আমার পছন্দকে নিজের পছন্দ হিসেবে গ্রহণ করে। এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, যিনি তার পছন্দকে অন্যের মধ্যে প্রভাবিত করেন সেই প্রভাবিত ব্যক্তিটি পছন্দ বিস্তারকারীর ফ্যান হয়ে যায়। ‘ফ্যান’ শব্দটি সাংস্কৃতিক বা ফিল্মী শব্দ। বাংলারূপ হচ্ছে ‘ভক্ত’ বা ‘অত্যুৎসাহী সমর্থক’। সোজা কথায় আমরা যাকে মানসিক গোলাম বা দাসশ্রেণি অথবা আরো স্থূলভাবে বলতে গেলে দালাল হিসেবে অভিহিত করি। যুগ যুগ ধরে মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই শ্রেণির দালাল তৈরি করছে পশ্চিমারা। বোধ করি, সকলেই সহমত হবেন, স্বাধীনতার ৪৫ বছরেও আমরা সংস্কৃতির পথ-নির্দেশ সাব্যস্ত করতে পারিনি। বরং দলীয় নীতি এসবের ওপর আছর করেছে। ঐকমত্য হওয়া ভালো কিন্তু রাষ্ট্র-নির্দেশিত ঐকমত্যের তিক্ত অভিজ্ঞতায় দইকে চুন বলে মনে করতে পারি না। গড়পরতা মতৈক্য এবং এর মধ্যে নানামুখী মিথস্ক্রিয়তাই বাঞ্ছনীয়। বিস্তারিত বিশ্লেষণের কাটাছেঁড়ায় না ঢুকে বলতে পারি, বিশ্বায়ন, জাতি, রাষ্ট্রীয় সাবেকী ধরন-ধারণের বিলুপ্তি, নগরায়ন এবং মিডিয়ার বেধড়ক ব্যাপ্তিতে জনজীবন ও সংস্কৃতিতে অপরিমেয় প্রভাব পড়ে গেছে। এর মধ্যে মিডিয়া বিশেষ করে বৈদ্যুতিক গণমাধ্যম বা ইলেকট্রনিক মিডিয়া সংস্কৃতির একটা নবাবী স্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়েছে। খবর, নাটক, গান, যাত্রা, ব্যান্ড, রকমারি বিজ্ঞাপন প্রতি মুহূর্তে আমাদের চেতনাকে আঘাত হানছে। পেছনে স্পন্সরশিপের মূল নাটাইটা ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষদের হাতে। যেমন, বাংলাদেশের বহুজাতিক ও বড় পুঁজির কোম্পানিগুলোর মার্কেটিং কম্যুনিকেশন এবং দশাসই বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলোর ক্রিয়েটিভ হেডগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কলকাতার হিন্দি মগজধারী বাঙালি তরুণরা। মালিকদের মেয়ে-ছেলের সঙ্গে বিয়ে করে মোটামুটি তারা এখানে সেটেলড। বাংলা এবং বাঙ্গালী সংস্কৃতির মৃত্যু অবধি কাজ করে যেতে তারা বদ্ধপরিকর। একজন সমাজ বিজ্ঞানী যথার্থই বলেছেন ”Man dies when his heart fails and nation dies when its culture dies” মানুষ মৃত্যুবরণ করে যখন তার হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। ঠিক তেমনি একটি জাতিরও মৃত্যু ঘটে, যখন তার সংস্কৃতিকে মেরে ফেলা হয়। আমাদের দেশের বর্তমান সমাজ ব্যবস্থা পশ্চিমা ভোগবাদী আগ্রাসনের শিকার। যারা নারী স্বাধীনতার কথা বলে, আবার এরাই নারীকে ‘বাণিজ্যিক পণ্য’ বানিয়ে ফায়দা লুটছে। একটা নূতন গাড়ির বিজ্ঞাপনে ‘অর্ধনগ্ন নারী শরীরের ভূমিকা কী? আমাদের সমাজও সে বাতাসে গা ভাসিয়ে দিয়েছে, কিন্তু দুই বিপরীত মেরুর মূল্যবোধের দ্বন্দ্বে দিশেহারা হয়ে যাচ্ছে উঠতি প্রজন্ম। কেউ ইসলামী মূল্যবোধ আঁকড়ে থাকতে চাইলে তাকে চরম ‘কষ্ট স্বীকার করতে হচ্ছে। বাড়ির কাছে ভারতেই ‘লিভ টুগেদার’ বেশ তোড়েজোরে শুরু হয়েছে, বড় শহরগুলোতে, এমনকি ঢাকাতেও এমনটা এক্কেবারে চলছে না, তা জোর দিয়ে বলা যাবে না। 
আমাদের দেশে এখনও পুরুষ প্রধান সমাজব্যবস্থা প্রচলিত। পুরুষকে তার পরিবারের জন্য খাদ্য, বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে হয়, না হলে সমাজে তার ইজ্জত থাকে না, মর্যাদা থাকে না। যার জন্য প্রতিটি সক্ষম পুরুষ সেই মাপের চেষ্টা করে। শুধু আবেগ দিয়ে সংসার চলে না। ভরণ পোষণের ‘সামর্থ্য না থাকলে বিয়ে করা যাবে না, বরং ‘রোজা থেকে ‘হরমোনের প্রাবল্য থেকে আত্মরক্ষা তথা ‘সংযম অভ্যাসের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু চোখের সামনে এত ‘প্রলোভন, এর উপরে ‘ইন্টারনেট এর কল্যাণে যদি ‘আধুনিকা কারো সাথে সে ধরনের যোগাযোগ হয়ে যায় পা পিছলানোর এত ‘আড়ম্বর চারপাশে, পিছলে যেতে সময় লাগে না। পশ্চিমাদের অনুকরণে বয়ফ্রেন্ড-গার্লফ্রেন্ড সম্পর্ক এখন ‘গ্লোরিয়াস, মর্যাদাপূর্ণ, সমাজে গ্রহণযোগ্য। এক সময় এ ধরনের সম্পর্ককে ‘নোংরা হিসেবে, সমাজে অশ্রাব্য, দূষণীয় হিসেবে দেখা হত। প্রেমিক বা বয়ফ্রেন্ড নয়, বলা হত- নাগর! সমাজের নিম্ন স্তরে অবস্থানকারী মানুষ, যাদের বিয়ে করা বা বিয়ের আনুষ্ঠানিকতার পর্বে যাওয়ার সামর্থ্য ছিল না, তাদের মধ্যে এমনটা চালু ছিল। কোন সভ্য ঘরের ছেলে মেয়ে এমন কর্মে লিপ্ত হবে তা কল্পনাতেও আসত না। যখন দাস প্রথা চালু ছিল সেই যুগেও স্বাধীন নর নারী এমনটা ভাবতে পারত না। সাংস্কৃতিক আগ্রাসন রোধে নেই কোন পদক্ষেপ, নেই কোন আগ্রহ। সাংস্কৃতিক আগ্রাসন সম্পর্কে আমাদের বর্তমান প্রজন্মের সামনে কোনো স্বচ্ছ সংজ্ঞা দেশের বুদ্ধিজীবী থেকে রাজনীতিবিদ এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় বড় শিক্ষকরা পর্যন্ত রাখতে পারছেন না। ঠিক এ কারণেই অমিত সম্ভাবনার দেশ হয়েও বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক দেউলিয়াত্বের তিলক পড়তে বাধ্য হচ্ছে। অবাধ আকাশ সংস্কৃতির যুগে বর্তমান প্রজন্ম শুধু দেশীয় চ্যানেলে পড়ে থাকবে এমনটা ভাবাই এখন অশোভন বলে মনে হলেও ভীনদেশী সংস্কৃতি যে আমাদের কতটা ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে তা বর্তমার প্রজন্মের আচার আচরণ দেখলেই অনুমান করা যায়। যুবক তরুণ, বৃদ্ধ, নবীন, প্রবীণ সর্বোপরি বাংলাদেশের দর্শকরা এখন আর নিজেদের চ্যানেল দেখে না বললেও বেশি বলা হবে না। জি বাংলা আর স্টার জলসার বিভিন্ন অনুষ্ঠানের দৌরাত্ম্যে তারা একেবারে দিশেহারা। হেমিলনের বাঁশিওয়ালা বাঁশিতে ফুঁ দিতেই তারা জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটছে ঊর্ধ্বশ্বাসে, বাঁশি থামার সাথে সাথেই ঝাঁপিয়ে পড়ছে সাগরে। ‘কিরণ মালা’ আমাদের মনে এমন এক প্রভাব বিস্তার করেছে তা দেখা নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া হচ্ছে যা থেকে ঘটে যাচ্ছে আত্মহননের মতো ঘটনা। ‘বোঝে না সে বোঝে না’ ধারাবাহিকের নায়িকা ‘পাখি’র নামের পোশাক কিনে না দেয়ায় কিশোরী অভিমানে বিষ পান করছে। কী শেখানো হচ্ছে এসব ধারাবাহিকে? একটি সাজানো যৌথ পরিবার কূটবুদ্ধির প্রয়োগে কীভাবে ছিন্নভিন্ন করা যায় তাই তো? এ ধারাবাহিকগুলোর প্রভাব এমন অপ্রতিরোধ্য বিশেষত আমাদের দেশের নারী দর্শকরা সেই পর্দার চরিত্রকেই মনে করছে আসল চরিত্র আর সেই জীবনকেই মনে করছে প্রকৃত জীবন। তাদের আদলে সংসার সাজাতে গিয়ে মুখোমুখি হচ্ছে দারুণ বিড়ম্বনার। আর এভাবেই কাঠপোকার মতো ভারতীয় সংস্কৃতি আমাদের ভেতরে ভেতরে খেয়ে একদম শেষ করে দিচ্ছে আর উপরে যা থাকছে তা একটি খোলস মাত্র। তাই বর্তমানে যা আছে তা হলো দেশীয় সংস্কৃতির মোড়কে বিজাতীয় সংস্কৃতির বেলাল্লাপনা। আস্তে আস্তে আমাদের লজ্জা ভাঙা হচ্ছে এরপর সুযোগ বুঝে দেশীয় সংস্কৃতি মূলোৎপাটনের কাজটা হচ্ছে। এখনই সময় এ অবস্থা থেকে উত্তরণের, নয় তো আমাদের সন্তানরা বেলাল্লাপনা করবে আর আমরা হব তার নীরব দর্শক। একজন নয়ন জুড়ানো সন্তান পাওয়ার আকাক্সক্ষা শুধু আকাক্সক্ষাই রবে, তা আর বাস্তবে রূপ নিবে না। আসুন আমরা যার যার অবস্থান থেকে একদম ব্যক্তি পর্যায়ে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন রুখে দাড়াই। আপনার আমার আজকের একটু সাংস্কৃতিক সচেতনতা, একটা দৃঢ় পদক্ষেপই আমাদের বর্তমান প্রজন্মকে নিশ্চিত অন্ধকার পিচ্ছিল পথ থেকে আলোর পথে যেতে সহায়তা করবে। 

বুধবার, ২০ এপ্রিল, ২০১৬

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

দখল-বেদখল ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা


আমাদের সমাজে এখন দখল-বেদখলের নানারূপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ‘বারো রকমের দখল’ শিরোনামে একটি খবর মুদ্রিত হয়েছে বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায়। ১৭ এপ্রিল প্রকাশিত খবরটিতে বলা হয় : দখল-বেদখল, পাল্টা দখলের সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছে দেশজুড়ে। ক্ষমতার প্রভাব, দলীয় পরিচয়, অস্ত্রের বল আর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা নিয়ে চলছে দখলবাজির দাপুটে কারবার। বিচারপতির বাড়ি, সরকারি সম্পত্তি, টেন্ডার থেকে শুরু করে পেশাজীবীদের ক্লাব-সংগঠনও দখলবাজির ধকল থেকে রেহাই পাচ্ছে না। সারা দেশে প্রভাবশালীরা সর্বত্রই গড়ে তুলেছে দখলবাজির সিন্ডিকেট। এ মুহূর্তে চলছে সারা দেশে ভোটকেন্দ্র দখলের দাপুটে কারবার। নির্বাচন কমিশন আছে, তাদের নিয়োজিত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও কোমরে গামছা বেঁধে চষে বেড়াচ্ছেন মাঠ-ময়দান। কিন্তু তাদের সামনে মুখ চেনা মানুষেরা কেন্দ্রে কেন্দ্রে হানা দিয়ে জবর দখল করে নিচ্ছে ব্যালট-বাক্স। মুন্সিগঞ্জের একটি ভোট কেন্দ্রে পুলিশ সিল মারছে এমন ছবিও ছাপা হয়েছে পত্রিকায়। শুধু জায়গা-জমি, ভোট কেন্দ্র দখল করেই জবর দখলকারীরা ক্ষান্ত থাকছেন না; তারা পদ পদবী দখল করতেও সিদ্ধহস্ত হয়ে উঠেছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতি জবর দখল করে রেখেছেন অছাত্ররা। উক্ত পত্রিকায় খাল-বিল, নদী-নালা, ফুটপাত এমনকি খেলার মাঠ ও শিশু পার্ক দখলের চিত্রও উঠে এসেছে। একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশে এমন অবস্থা কী করে বিরাজ করে তা ভাবতে গেলে বিস্মিত হতে হয়।
পত্রিকার প্রতিবেদনে দখলের যে দৌরাত্ম্য লক্ষ্য করা গেল, তাতে স্পষ্টভাবেই উপলব্ধি করা যায় যে, দেশের শাসন-প্রশাসন ঠিকভাবে চলছে না। আমরা নিজেদের গণতান্ত্রিক ভাবতে ভালবাসি, সরকারও সুশাসনের অঙ্গীকার ব্যক্ত করতে গর্ব অনুভব করেন কিন্তু গণতন্ত্র ও সুশাসনের এ কেমন চিত্র? আমরা তো এ কথা বেশ ভালভাবেই উপলব্ধি করি যে, দখলের দৌরাত্ম্য চালাতে শক্তির প্রয়োজন হয়, প্রয়োজন হয় প্রশাসনের সহযোগিতাও। এসব সুবিধা তো সব সময় সরকারি ঘরানার লোকদের হাতেই থাকে। এখনও সরকারি দলের লোকজনই দখলবাজির দাপুটে কারবার চালিয়ে যাচ্ছে। এসব কাজ তো দেশের সংবিধান এবং সরকার ও সরকারি দলের অঙ্গীকারের বিপরীত কাজ। কোনো যুক্তিতেই দেশে দখলের দৌরাত্ম্য চলতে দেয়া যায় না। কারণ এমন দৌরাত্ম্যে শুধু যে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় তা নয়; ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের প্রকৃত উন্নয়নও। সুশাসনের অভাবে দখলের এমন দৌরাত্ম্য চলতে থাকলে, আখেরে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিপর্যস্ত হয়। এমন অবস্থায় জনমনে আতঙ্কের পাশাপাশি বাড়তে থাকে ক্ষোভের মাত্রাও, যা কোনোভাবেই সরকারের জন্য কল্যাণকর বলে বিবেচিত হতে পারে না। কোনো সমাজে ন্যায়ের চর্চা না হলে, সুশাসন না থাকলে তার ফল ভোগ করতে হয় সবাইকেই। সরকারি দলের লোকজনও এখন তা উপলব্ধি করছেন। জুলুম-নিপীড়ন ও অবদমনের মাধ্যমে বিরোধী জোটকে দুর্বল করার পর এখন সরকারি দলের লোকজন কি ভাল আছেন? এখন তো প্রায় প্রতিদিন তাদের নিজেদের মধ্যে দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও হতাহতের ঘটনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সরকারি দলের নেতা-কর্মীদের সন্ত্রাসে জনপদ কেঁপে উঠছে। আসলে ন্যায়-নীতি ও সুশাসন না থাকলে দুর্বৃত্তদের দৌরাত্ম্যই বাড়ে। বিশেষ দলের নাম কিংবা তেজস্বী বক্তৃতার কারণে কখনও পরিস্থিতির কাক্সিক্ষত পরিবর্তন আসতে পারে না। এমন চিত্রই এখন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
আমাদের নেতারা তো বক্তৃতা-বিবৃতিতে প্রায়ই বলে থাকেন, ব্যক্তির চাইতে দল বড়, দলের চাইতে দেশ বড়। কিন্তু বাস্তবে তো এমন বক্তব্যের প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায় না। বরং যখন দেশের চাইতে দল বড় হয়ে ওঠে এবং দলের চাইতে বড় হয়ে ওঠেন ব্যক্তি, তখন নেতা-নেত্রীদের বক্তব্যের অন্তঃসারশূন্যতাই প্রতীয়মান হয়। কথা ও কাজের গরমিলের কারণে দেশে এখন দুর্বৃত্তায়নের দৌরাত্ম্য ও দখল-বেদখলের কারবার চলতে পারছে। এমন অবস্থা আখেরে কারো জন্যই মঙ্গলজনক হতে পারে না। বিষয়টি যাদের বোঝা উচিত তারা যে বোঝেন না তা কিন্তু নয়। কিন্তু সঠিক কোনো কাজ করতে হলে বোঝার সাথে প্রয়োজন হয় আরো কিছু বিষয়। সেই বিষয়গুলো হলো জবাবদিহির চেতনা ও নৈতিক মেরুদণ্ড এ দু’টি বিষয় আমাদের সমাজে ও রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে প্রয়োজন আদর্শের রাজনীতি। এমন রাজনীতির এখন দুর্ভিক্ষ চলছে। আমাদের সরকার ও রাজনীতিবিদরা এই দুর্ভিক্ষ দূর করতে পারলে অন্যসব দুর্ভিক্ষ থেকে জাতি মুুক্তি পেতে পারে। আমাদের রাজনীতিবিদরা আদর্শিক রাজনীতির ঝাণ্ডাকে সমুন্নত করতে পারেন কিনা সেটাই এখন দেখার বিষয়। যারা আদর্শের রাজনীতি করবেন তাদের অবশ্যই দখল-বেদখলের দৌরাত্ম্য দূর করার পাশাপাশি মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায়ও মনোযোগী হতে হবে।
বর্তমান সভ্যতায় মানবাধিকারের বিষয়টি সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। দেশে-বিদেশে নানাভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। আর আমরা তো একথা জানি যে, উন্নত ও সম্মানজনক জীবন-যাপনের জন্য মানবাধিকার আবশ্যিক বিষয়। মানবাধিকার যতটা লঙ্ঘিত হবে মানুষের জীবন ততটাই মানবেতর হয়ে উঠবে। প্রসঙ্গত এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। সাধারণ মানুষ কিন্তু মানুষের অধিকার তেমন ক্ষুণ্ন করতে পারে না। কারও অধিকার ক্ষুণ্ন করতে হলে ক্ষমতা প্রয়োজন, কালাকানুন প্রয়োজন। অর্থাৎ মানবাধিকার  ক্ষুণ্ন করতে পারেন শক্তিমানরাই। এই কথা সমাজ, রাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক বলয়ে খুবই প্রাসঙ্গিক বর্তমান সময়ে।
মানবাধিকার নিয়ে বর্তমান বিশ্বে বিভিন্ন সংস্থা এবং রাষ্ট্র প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে, গবেষণাও করে থাকে। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০১৫ সালের মানবাধিকার প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুসারে প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার বিষয়ক প্রতিবেদন মার্কিন কংগ্রেসের কাছে পেশ করেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এবার দেশটির ৪০তম বার্ষিক মানবাধিকার প্রতিবেদনে ১৯৯টি দেশের মানবাধিকার প্রতিবেদন পেশ করা হয়েছে। বাংলাদেশ প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়: বিচারবহির্ভূত হত্যা, নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক নির্যাতন, গণগ্রেফতার, কারাবন্দিত্ব, বিচার বিভাগের সামর্থ্যহীনতা, নাগরিকের ব্যক্তিগত অধিকার লঙ্ঘন, গুম, ব্লগার-অনলাইন ও গণমাধ্যমের ওপর হস্তক্ষেপ, নিম্নমানের কর্মপরিবেশ ও শ্রমিকদের অধিকারহীনতা বাংলাদেশের প্রধান মানবাধিকার সংকট। এছাড়াও প্রতিবেদনে বাংলাদেশের দুর্নীতি এবং সরকারের কাজকর্মের অস্বচ্ছতাকে মানবাধিকারের সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক বিতর্কিত এবং আন্তর্জাতিক মানদ-ের ঘাটতি ছিল বলে মত দিয়েছেন। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে এবং যুদ্ধাপরাধের বিচারে সততা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়।
মার্কিন মানবাধিকার রিপোর্টে বাংলাদেশের যে চিত্র ফুটে উঠেছে তা মোটেও সম্মানজনক নয়। দেশের এমন চিত্র দেশের কোনো নাগরিকের ভালো লাগার কথা নয়। এমন রিপোর্ট সরকারের জন্যও অস্বস্তিকর। তবে মার্কিন মানবাধিকার রিপোর্টে যদি কোনো ত্রুটি থাকে কিংবা ভুল তথ্য পরিবেশিত হয়ে থাকে, তাহলে তার সংশোধন প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সরকার তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে প্রতিবাদও জানাতে পারে। তবে বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি যে কাক্সিক্ষত পর্যায়ে নেই তা দেশটির নাগরিকদের চাইতে আর কারো ভালো জানার কথা নয়। বিভিন্ন ক্ষেত্রেই মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। প্রসঙ্গত এখানে বলে রাখা ভাল যে, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উন্নত বিশ্ব যে প্রতিবেদন প্রকাশ করছে তা আরও অর্থবহ হতো, যদি ওইসব দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘিত না হতো। পরাক্রমশালী কোনো কোনো দেশ তো নিজের সীমানা পেরিয়ে ভিন্ন দেশেও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বড় বড় উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। এইসব উদাহরণ বিশ্বের মানবাধিকার পরিস্থিতিকে নাজুক করে তুলেছে। ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে তো বড় বড় দেশকে আমরা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় দিতে দেখেছি। এক্ষেত্রেও আত্মসমালোচনা প্রয়োজন, প্রয়োজন সংশোধন।

মঙ্গলবার, ১৯ এপ্রিল, ২০১৬

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

হুমকির মুখে বাংলাদেশ


শিল্পোন্নত দেশগুলোর অতিমাত্রায় কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন আর বিলাসী জীবনযাপনের কারণে পৃথিবীর জলবায়ুতে যে পরিবর্তন ঘটছে, তাতে সবচেয়ে বেশি হুমকির মুখে পড়েছে বাংলাদেশ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা দুই মিটার বাড়লে বাংলাদেশের প্রায় তিন কোটি মানুষ বাস্তুহারা হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যে দুর্যোগ হয় তা প্রতিরোধ করতে পারলে হাজারো জীবন বাঁচানো সম্ভব বলে মন্তব্য করেন জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন।
গবেষকরা মনে করেন, পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য অন্যতম দায়ী কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনের হার কমাতে উন্নত দেশগুলোর ওপর চাপ প্রয়োগ করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর বিশ্বের ওইসব দেশের কাছ থেকে যাতে ক্ষতিপূরণ পায়, তা নিশ্চিত করতে জাতিসংঘকে ভূমিকা নেওয়ার জন্যও চাপ সৃষ্টি করতে হবে।
১৯৯২ সালে জাতিসংঘ একটি কনভেনশন গ্রহণ করে। এতে প্রতিটি শিল্পোন্নত দেশ স্বাক্ষর করে অঙ্গীকার করে যে ২০০০ সালের মধ্যে নিজ নিজ দেশে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন শতকরা পাঁচ ভাগ কমিয়ে আনবে। কিন্তু একটি দেশও ওই অঙ্গীকার রক্ষা করেনি, বরং তা প্রতিবছর বেড়েই চলেছে। আর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দরিদ্র দেশগুলো। লন্ডনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘ম্যাপলক্রফট’ বিশ্বের ১৭০টি দেশের ওপর জরিপ চালিয়ে ১৬টি দেশকে ‘চরম ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। এ তালিকার শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। গত বছর অক্টোবরে ম্যাপলক্রফট এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, ১৬টি দেশের মধ্যে পাঁচটিই দক্ষিণ এশিয়ার। তালিকায় বাংলাদেশের পরেই আছে ভারত। ক্ষতির দিক থেকে বাংলাদেশকে বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে মনে করা হচ্ছে দুটি কারণে। এক. সর্বোচ্চ মাত্রায় অনাবৃষ্টি। দুই. চরম জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক বিপদ ধেয়ে আসছে বাংলাদেশের দিকে।
বাংলাদেশের প্রায় তিন কোটি মানুষ বাস্তুহারা হয়ে পড়বে: বিপদ মোকাবিলার জন্য বাংলাদেশ ইতোমধ্যে আইন প্রণয়ন করে ‘জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট’ গঠন করেছে। কিন্তু কার্যকর কোনো পদক্ষেপ এখনও নেওয়া হয়নি। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশ সম্পূর্ণ প্রস্তুত নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর কাজ এগিয়ে নিতে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন। জলবায়ু পরিবর্তনের বিষযটিতে উন্নত-অনুন্নত সব দেশের নেতাদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করারও আহ্বান জানান তিনি।
১৪ নবেম্বর রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের (সিভিএফ) দুই দিনব্যাপী সম্মেলনের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বান কি মুন এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন। বান কি মুন বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের সব দেশই হুমকির মুখে রয়েছে। কোনো দেশই হুমকির  বাইরে নয়। জলবায়ু পরিবর্তন দেশই হুমকির বাইরে নয়। জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে বিশ্বের নেতাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, সাধারণ মানুষ সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
৭০০ কোটি জনসংখ্যার বিশ্বকে নিরাপদ ও উন্নত হিসেবে গড়তে আমাদের সবার ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বিকল্প নেই। তবে সবার সমস্যা এক ও অভিন্ন। আমাদের অবশ্যই ঐক্যবদ্ধ হয়ে এ সমস্যা মোকাবিলায় কাজ করতে হবে। ইতিহাসের মধ্যে রেকর্ড পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ গত বছর হয়েছে বলে তিনি জানান।
বাংলাদেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রশংসা করে জাতিসংঘের মহাসচিব বলেন, এখানে আমি তিন বছর আগে এসেছিলাম। ১৯৭৩ সালেও কয়েকবার এসেছি। এ সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের অনেক সামাজিক-অর্থনৈতিক অগ্রগতি হয়েছে। তবে ১৯৯১ ও ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড়ে এ দেশের অনেক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। অনেক ক্ষতি হয়েছে। বাংলাদেশের ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ড গঠনেরও প্রশংসা করেন তিনি।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যে দুর্যোগ হয় তা প্রতিরোধ করতে পারলে হাজারো জীবন বাঁচানো সম্ভব বলে মন্তব্য করেন বান কি মুন। তিনি বলেন, কিরিবাতির সর্বোচ্চ জমিটি সাগরপৃষ্ঠ থেকে ৩ মিটার উঁচু। কিরিবাতির ওই এলাকায় আমাকে লাইফ জ্যাকেট দেয়া হয়েছিল। গত মাসে ৭০০ কোটি জনসংখ্যা অতিক্রম করা এ বিশ্বকে নিরাপদ ও উন্নত হিসেবে গড়তে আমাদের সবার ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বিকল্প নেই। এ জন্য রাজনৈতিক, ব্যবসায়ী, সাধারণ মানুষ সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির মধ্যে থাকা দেশগুলোর অন্যতম উদাহরণ বাংলাদেশ। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশকে দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা যায়।’ বাংলাদেশ সফলতার সঙ্গে অনেক প্রাকৃতিক দুর্যোগের মোকাবিলা করেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সিভিএফ সম্মেলনে আসা মতামতগুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার জন্য ইউএনএফসিসিসির সব সদস্যের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন মহাসচিব। বান কি মুন বলেন, ‘গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডের তহবিল বণ্টন এবং নতুন তহবিল গঠনে স্বচ্ছতা আসবে- ডারবান সম্মেলনে, এমন ঘোষণা আসবে বলে আমি মনে করি না।’ অনুষ্ঠানে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন বলেন, ডারবানেই গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডের তহবিল সংগ্রহ শুরু করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, দুর্যোগ প্রস্তুতিতে বাংলাদেশ গোটা বিশ্বকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা দুই মিটার বাড়লে বাংলাদেশের প্রায় তিন কোটি মানুষ বাস্তুহারা হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা রয়েছে। দরিদ্রদের দুঃখ-দুর্দশা দিন দিন বাড়ছে: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় দ্রুত ও শর্তহীন সহায়তা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তিনি বলেন, জলবায়ু সহায়তায় শর্ত গ্রহণযোগ্য নয়। সক্ষম দেশগুলোর কাছ থেকে সহজে ও সরাসরি অর্থ এবং প্রযুক্তি সহায়তা পাওয়ার কোনো লক্ষণ আমরা দেখছি না। এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা জলবায়ুর ঝুঁকি মোকাবিলায় তহবিল ছাড়ের ধীরগতিতে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরাম (সিভিএফ) ২০১১- এর দু’দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির ভাষণদানকালে শেখ হাসিনা এ কথা বলেন। একই সঙ্গে তিনি ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার লক্ষ্যে ঝুঁকি এবং সামর্থ্যরে ঘাটতিকে বিবেচনায় নিয়ে একটি মানদণ্ড তৈরির আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘এছাড়া যেসব শর্ত দেওয়া হচ্ছে তা স্বল্পোন্ত অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য গ্রহণযোগ্য নয়। অধিক ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা পেতেও ব্যর্থ হচ্ছে।’ প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্রেও সহায়তার সুনির্দিষ্ট কোনো উদ্যোগ আমরা দেখতে পাচ্ছি না। এছাড়া ‘দ্রুত অর্থায়ন’ কর্মসূচির কর্মপদ্ধতির ওপর আস্থা রাখা হচ্ছে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন এখনও বেড়েই চলেছে। এ ধারা বিশ্বের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এতে বাংলাদেশসহ মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ ও সম্পদের সীমাবদ্ধতা আছে এমন দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের জীবনযাত্রায় মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। উন্নয়নমূলক কর্মকা-ের ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। কোনো কোনো দেশের অস্তিত্বই হুমকির মুখে। অথচ এ জন্য আমরা  মোটেই দায়ী নই। চরম অবিচারের শিকার আমরা। বিশ্বকে এটি স্বীকার করতে হবে। এর সংশোধন ও প্রতিকারমূলক ব্যবস্থাও দ্রুত গ্রহণ করতে হবে।’
দ্বিতীয় সিভিএফ বৈঠকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ২০টি দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। ২০০৯ সালের নভেম্বরে মালদ্বীপের রাজধানী মালেতে ফোরামের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা বৈঠকে পররাষ্ট্র সচিব মোহাম্মদ মিজারুল কায়েস স্বাগত বক্তব্য এবং পরিবেশ সচিব মেসবাহ-উল আলম ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। ডিএআরএ ও অন্যান্য উন্নয়ন অংশীদারের প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তায় পররাষ্ট্র এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় যৌথভাবে অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে। সিভিএফ ফোরামের সদস্য দেশগুলো হলো-আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, ভুটান, কোস্টারিকা, ইথিওপিয়া, গাম্বিয়া, ঘানা, কেনিয়া, কিরিবাতি, মাদাগাস্কার, মালদ্বীপ, নেপাল, ফিলিপাইন, সেইন্ট লুসিয়া, তাঞ্জানিয়া, তিমুর লেসতি, তুভালু, ভানুয়াতু এবং ভিয়েতনাম।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দরিদ্রদের দুঃখ-দুর্দশা দিন দিন বাড়ছে। শুধু এর প্রভাবে গত বছর অতিরিক্ত তিন লক্ষাধিক লোকের মৃত্যু ঘটে এবং ১৩ হাজার কোটি মার্কিন ডলারেরও বেশি সম্পদ বিনষ্ট হয়। সময়মতো পর্যাপ্ত পদক্ষেপ নিতে না পারলে ক্ষতি আরও বাড়বে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ডারবানে জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত বৈঠকের আগে ঢাকায় সিভিএফের দ্বিতীয় বৈঠকের ফলে দুর্গত দেশগুলোর সমস্যার গভীরে প্রবেশ করে এ ব্যাপারে সম্মিলিতভাবে করণীয় নির্ধারণের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, এই সিভিএফ বৈঠকের মাধ্যমে ক্রমবর্ধমান হুমকি কার্যকরভাবে মোকাবিলা ও একটি কার্যকর অংশীদারিত্ব গড়তে আমাদের অঙ্গীকারেরও প্রতিফলন ঘটেছে। প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু তহবিল ও প্রযুক্তির ব্যাপারে ‘যেসব শর্ত ও মানদণ্ড দেওয়া হয়েছে তা সক্ষম দেশগুলোর পক্ষে গেছে বলে মনে করেন।’
জলবায়ু পরিবর্তনের সহায়তার সঙ্গে উন্নয়ন সাহায্যকে মিলিয়ে ফেলার প্রবণতার ঘটনায় হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, উন্নয়ন সহায়তা ছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অতিরিক্ত ব্যয় মেটাতে আমাদের নতুন ও অতিরিক্ত সাহায্য দিতে হবে।
তিনি বলেন, ‘কানকুনে গৃহীত ২০১১-১২ সালের জন্য তহবিল সংগ্রহের প্রতিশ্রুতি পূরণের বিষয়টি সুদূরপরাহত। একইভাবে আমরা লক্ষ্য করছি, ‘গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড’ চালুর মাধ্যমে ২০১২ থেকে ২০২০ পর্যন্ত তহবিল সংগ্রহের বিষয়টিও বিশ্ব সম্প্রদায় স্পষ্ট করছে না।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বড় বড় কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলো প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে চরম অনীহা দেখাচ্ছে। বাধ্যতামূলক ও স্বতঃপ্রণোদিত প্রতিকারের ব্যবস্থা না নেওয়ায় কিয়োটো প্রটোকলের আশানুরূপ বাস্তবায়ন হচ্ছে না। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এ উদাসীনতা বিশ্ব জলবায়ুকে তছনছ এবং বিভিন্ন দেশকে আরও সংকটের মধ্যে ফেলে দেবে।
শিল্পোন্নত দেশগুলোকে তাদের ঐতিহাসিক দায়-দায়িত্ব পালন ও সহনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, একইভাবে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোরও নৈতিক দায়িত্ব আছে এবং সক্ষমতা ও সামর্থ্যরে ভিত্তিতে তাদেরও স্বপ্রণোদিতভাবে এগিয়ে আসা উচিত।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটি বহুল স্বীকৃত যে, জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রতিঘাতে মানুষ উদ্বাস্তুতে পরিণত হবে। বৈশ্বিক আলোচনায় সমুদ্রস্তর বৃদ্ধি ও মরুকরণ প্রক্রিয়া কম গুরুত্ব পাচ্ছে। বাস্তুচ্যুতদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাদের পুনর্বাসন ও চাহিদা পূরণের ওপর গুরুত্বারোপ করে শেখ হাসিনা বলেন, জলবায়ু উদ্বাস্তুদের নিরাপত্তার জন্য একটি যথোপযুক্ত রূপরেখা প্রণয়নে আমাদের এগিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জট্রাস্ট ফান্ড অ্যাক্ট ২০১০ এর উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশ্ব কী করবে, সে আশায় ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর বসে থাকার সুযোগ নেই। শেখ হাসিনা বলেন, ডারবানে সিওপি ১৭ সম্মেলনের আগে আমাদের ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর সমন্বিত উদ্বেগের বিষয়গুলো চিহ্নিত করতে হবে। তিনি জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জকে সবুজ উন্নয়নের দিশারিতে পরিণত করার আহ্বান জানান এবং বলেন, ‘উন্নয়ন সহাযোগীরা জলবায়ুর প্রভাব মোকাবিলায় আমাদের সক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামকে আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া প্রভাবিত করার সামর্থ্য অর্জন করতে হবে, যাতে বিশেষ করে জি-৮, জি-২০, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এবং জাতিসংঘ ও এর অঙ্গ সংগঠনগুলো আমাদের চাহিদা ও প্রয়োজনীয়তা এবং চ্যালেঞ্জগুলো সার্বিকভাবে অনুধাবন করতে পারে। নারীর ওপরই প্রভাব বেশি: ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের দ্বিতীয় দিনের সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন। জলবায়ু পরিবর্তনে বিপন্ন দেশগুলোর নেতৃত্বে ২০০৯ সালে ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরাম গঠিত হয়। মালদ্বীপের রাজধানী মালেতে এর সর্বপ্রথম সম্মেলন হয়। এবার হচ্ছে সিভিএফের তৃতীয় সম্মেলনে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় যৌথভাবে এ সম্মেলনের আয়োজন করেছে।
ইতোমধ্যে বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে আবহাওয়া পরিবর্তিত হচ্ছে। ঋতুগুলো স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে। নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হানছে। খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় থেকে ২০০৯ সালের জুলাই মাসে প্রকাশিত ‘দুর্যোগকোষ’- এ বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত বলা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে কম সম্পদ আছে যার, সেই ভুক্তভোগী হবে সবচেয়ে বেশি; বিশেষ করে নারীর ওপরই এর প্রভাব বেশি পড়বে। দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড পপুলেশনের মতে, বিশ্বের ১.৫ বিলিয়ন দরিদ্র নারী জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের তালিকার সামনের সারিতে রয়েছে। প্রাকৃতিকভাবে বিপর্যন্ত এলাকায় নারীর প্রতি সহিংসতার মাত্রা বেড়ে যায়। ধর্ষণ, যৌন হয়রানিসহ নানা ধরনের মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হয় নারীকে। বিপর্যয়-পরবর্তী অবস্থায় ঘরে ও শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতেও নারীরা সহিংসতার শিকার হয়।
জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত আন্ত:সরকারি প্যানেলের (আইপিসিসি) প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়বে, সুপেয় পানি পাওয়া যাবে না এবং জমি অনুর্বর হবে। এছাড়া দেশে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাবে, কৃষিক্ষেত্রে বিপর্যয় নেমে আসবে, অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি, খরা, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়সহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে সমুদ্র তীর রক্ষায় নির্মিত বাঁধগুলো ধ্বংস হচ্ছে। উপকূলীয় ভূমি ক্ষয়ের পরিমাণ ভয়ঙ্করভাবে বাড়ছে। সমুদ্র বেশি উত্তাল হচ্ছে। জেলেদের জীবন হুমকিগ্রস্ত হচ্ছে। সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ থেকে সরকারের যে আয়, তাও হুমকির সম্মুখীন। দেশে বন্যার পরিমাণ বাড়ছে। উত্তরাঞ্চলে খরা বাড়ছে। ভূমির উর্বরতা কমছে। অতিবৃষ্টি ও অনাবৃষ্টির হারও বেড়ে যাচ্ছে।
স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত বিঘ্নিত হওয়ায় দেশটিকে ঘন ঘন বন্যা ও খরার সম্মুখীন হতে হয়। ১৯৭১ সালে বন্যা, ১৯৭২ সালে খরা আবার ১৯৭৪ সালে বন্যায় আক্রান্ত হয় দেশ। ১৯৭৭ ও ১৯৭৯ সালে খরার পর ১৯৮০ ও ১৯৮৪ সালে বন্যা হয়। মাঝখানে আবারও ১৯৮২ সালে খরা দেখা দেয়। এভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেন বাংলাদেশের কৃষির জন্য অবধারিত নিয়তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একসময় এ দেশে কয়েক হাজার প্রজাতির ধান চাষ হতো। বর্তমানে এ সংখ্যা প্রায় ১০০ তে দাঁড়িয়েছে। বন্যার কারণে আউস ও আমন ধানের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় কৃষক সেচনির্ভর বোরো ধানের দিকে ঝুঁকেছে। অন্যদিকে ডাল চাষের জমি কমে গেছে। পাট, গম ও আখের চাষও কমেছে। দক্ষিণাঞ্চলের আমতলীতে পাট, তামাক, গম ও তিল একেবারেই হারিয়ে গেছে। মনোহরপুরে তিসি, তরমুজ, তিল ও খেসারির স্থান দখল করেছে বোরো ধান। জলাবদ্ধতার কারণে আউস ও আমন ধান ওই অঞ্চল থেকে একেবারেই হারিয়ে গেছে। উত্তরাঞ্চলের উলিপুর থেকে হারিয়ে গেছে কাউন, গম ও পাট।
বিপর্যস্ত বাংলাদেশের কৃষি: গত কয়েক বছরে উপর্যুপরি বৈরী জলবায়ুর কবলে পড়ে বাংলাদেশের কৃষি যেভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে, তাতে এ আশঙ্কা দৃঢ়মূল হচ্ছে যে, ভবিষ্যতে দেশের কৃষি বৈরী জলবায়ুর সবচেয়ে বড় শিকারে পরিণত হতে যাচ্ছে। ২০০৯ সালের ৭ অক্টোবর ঢাকায় কৃষি মন্ত্রণালয় ও বিশ্বখাদ্য সংস্থা আয়োজিত যৌথ সম্মেলনে বিশেষজ্ঞরা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দেশের কৃষি ও মৎস্য খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। এ কারণে ২০৫০ সাল নাগাদ দেশে ফসলের উৎপাদন ১৫ থেকে ১৭ শতাংশ হ্রাস পাবে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বরেন্দ্র এলাকাগুলোতে বৃষ্টিপাত কম হয়। ফলে নিচে নেমে যাচ্ছে পানির স্তর। এসব এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানিও উত্তোলন করা হচ্ছে মাত্রাতিরিক্ত। এভাবে এখানে মরুভূমির পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে। রাজশাহীর আশপাশে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনও এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।
২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে ধানের উৎপাদন প্রায় ৮ শতাংশ এবং গমের উৎপাদন প্রায় ৩২ শতাংশ কমবে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। ফলে খাদ্য নিরাপত্তায় দেখা দেবে অনিশ্চয়তা। পাশাপাশি নতুন ধরনের জলবায়ু পরিস্থিতিতে নানা রকম স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে লবণাক্ত পানিতে মাছ ও অন্যান্য জীবের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে। বন উজাড় হওয়ার কারণে ৩০টি প্রজাতির বন্য প্রাণীর অস্তিত্ব হুমকির মুখে রয়েছে বলে জাতিসংঘ তথ্য প্রকাশ করেছে। বিপন্ন প্রাণীর মধ্যে রয়েছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিতাবাঘ, হাতি, অজগর সাপ, কুমির, ঘড়িয়াল ইত্যাদি। বিগত শতাব্দীতে বাংলাদেশে ১৯টি প্রজাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো গণ্ডার, বুনো মহিষ, কালো হাঁস, নীলগাই, রাজশকুন ইত্যাদি।
মৎস্যসম্পদ ধ্বংস হয়ে যাবে: জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশের মৎস্যসম্পদ ধ্বংস হয়ে যাবে বলে জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন। বর্তমানে মিঠাপানিতে ২৬০ প্রজাতির স্থানীয় মাছ, ৪৭৫ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ, ৩১ প্রজাতির বিদেশী মাছ ও ২৪ প্রজাতির চিংড়ি মাছ পাওয়া যায়। চিংড়ির মধ্যে ১৬ প্রজাতির রয়েছে সামুদ্রিক। এছাড়া ৪৫০ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক রয়েছে। এর মধ্যে ৩০০ প্রাজাতিই উপকূলবর্তী এলাকার। তথ্য মতে, ১৫, ২০ কিংবা ৩০ বছর আগে বাংলাদেশে যে ধরনের মাছ পাওয়া যেত, বর্তমানে তার বেশির ভাগই বিলুপ্ত অথবা হুমকির মুখোমুখি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করতে না পারলে আগামী কয়েক বছরে অন্যগুলোও বিলুপ্ত হবে।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক হিসাবে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষি খাতের অবদান প্রায় ৫৫ শতাংশ এবং গ্রামীণ জনপদের প্রায় ৫৪ সাম্প্রতিক দশকগুলোতে দেশের কৃষি বৈরী জলবায়ুর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি জলবায়ু ও আবহাওয়ার স্বাভাবিক অবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, জলবায়ু পরিবর্তনে অন্যতম একটি নিদর্শন বৃষ্টিপাতের ধরন পাল্টে যাওয়া। এখন আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে তেমন বৃষ্টি হয় না। আশ্বিন মাসে চার-পাঁচ দিন এমন পরিমাণে বৃষ্টি হয়, তাতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। ২০০৮ সালের চেয়ে ২০০৯ সালে ৩২ শতাংশ বৃষ্টিপাত কম হয়েছে। অথচ ২০০৯ সালের ২৭-২৮ জুলাই ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় ৩৩৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। এ বছর আবার বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বেশি হয়েছে। ১৯৭২, ১৯৭৯, ১৯৮৯, ২০০৯ সালে দেশ খরার কবলে পতিত হয়। খরাসহ বিভিন্ন কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দিনে দিনে নিম্নমুখী হয়ে সেচকাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি করছে। ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশে বন্যা হয়। স্বাভাবিক বন্যায় দেশের মোট আয়তনের প্রায় ৩০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়। কিন্তু জলবায়ু বৈরী হয়ে ওঠায় সাম্প্রতিক দশকগুলোতে শুধু বন্যার সংখ্যাই বৃদ্ধি পায়নি, এর তীব্রতাও বেড়ে গেছে। ১৯৭০ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত অন্তত ১২ বছর দেশ অস্বাভাবিক বন্যার কবলে পড়েছে। এর মধ্যে ১৯৮৮, ১৯৯৮ ও ২০০৪ সালের বন্যা ছিল প্রলয়ঙ্করী।
 দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে বিভিন্ন গবেষণায় জানা গেছে। দেশের মোট আয়তনের ৩২ ভাগই উপকূলীয় এলাকা (১৯টি জেলা), যেখানে প্রায় চার কোটি লোক বসবাস করে। জলবায়ু বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে কুতুবদিয়ার ২৫০ বর্গকিলোমিটার, ভোলার ২২৭ বর্গকিলোমিটার ও সন্দ্বীপের ১৮০ বর্গকিলোমিটার এলাকার ৬৫ শতাংশ ইতোমধ্যে সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়েছে। ২১০০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠ সর্বোচ্চ এক মিটার উঁচু হতে পারে বলে আশঙ্কা আছে। এর ফলে বাংলাদেশের মোট আয়তনের প্রায় ১৮.৩ শতাংশ নিমজ্জিত হতে পারে। কেউ কেউ অবশ্য এক-পঞ্চমাংশ পানিতে ডুবে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন। ইতোমধ্যে দক্ষিণ তালপট্টি সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে নোনা পানি ঢুকছে। শুষ্ক মওসুমেও বিভিন্ন নদীপথ দিয়ে দেশের অভ্যন্তরে ১০০ কিলোমিটারেরও বেশি এলাকা পর্যন্ত নোনা পানি ঢুকে পড়ছে। ফলে সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে ওই সব জেলায়। উপকূলীয় জেলাগুলো ছাড়াও বাগেরহাটের উত্তরাঞ্চলে, গোপালগঞ্জ, নড়াইলসহ অন্য জেলাগুলোতেও নোনা পানি ঢুকে পড়েছে। সুপেয় পানি সংকটের পাশাপাশি দেশের দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় আট লাখ ৩০ হাজার হেক্টর কৃষিজমি বিভিন্ন মাত্রার লবণাক্ততায় আক্রান্ত হয়ে উৎপাদনশীলতা হারাচ্ছে।
ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরাম (সিভিএফ) ২০১১-এর দুই দিনের এ সম্মেলনে কোস্টারিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট হোসে মারিয়া ফিগারস ওলসেনও যোগ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম কারণ কার্বন নিঃসরণ। আমরা যারা জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী নই, তারাই কথা বলছি জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে। শক্তিশালী দেশ এ বিষয়ে কোনো কথাই শুনতে চায় না।’ তিনি আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় ‘লো-কার্বন ইকোনমি’ গড়ে তুলতে আরও বহু পথ হাঁটতে হবে। মালদ্বীপের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আহমেদ নাসিম বলেন, ‘এবারের সম্মেলন ডারবানের জন্য বার্তা পাঠানো, কার্বন নিঃসরণ কমানো, অনুন্নত দেশগুলোকে সহায়তা করার বিষয়ে ফসল হবে।’ সিভিএফের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে আফগানিস্তান, ভুটান, কোস্টারিকা, ইথিওপিয়া, গাম্বিয়া, ঘানা, কেনিয়া, কিরিবাতি, মাদাগাস্কার, মালদ্বীপ, নেপাল, ফিলিপাইন, সেন্ট লুসিয়া, তানজানিয়া, তিমুললেসথে, তুভালু, ভানুয়াতু, ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি এ সম্মেলনে অংশ নিয়েছে।
আখতার হামিদ খান 

সোমবার, ১৮ এপ্রিল, ২০১৬

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

রাজজ্যোতিষীর ভবিষ্যদ্বাণী ও হাল আমলের বাংলাদেশ


প্রাচীন কালের রাজারা তাদের দরবারে জ্যোতিষী পুষতেন বলে জানা যায়। রাজজ্যোতিষীদের কাজ ছিল রাজপরিবারের সদস্যসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ভাগ্য গণনা, নূতন বছরের পঞ্জিকা প্রণয়ন, আবহাওয়ার পূর্বাভাষ প্রদান ও চাষাবাদের ব্যাপারে দিকদর্শন প্রণয়নে রাজ দরবারকে সহযোগিতা প্রদান। কথিত আছে যে, সিংহলের (বর্তমান শ্রীলংকা) রাজার একজন জ্যোতিষী ছিলেন। একবার রাজা এই জ্যোতিষীকে বৃষ্টির পূর্বাভাষ দেয়ার জন্য নির্দেশ প্রদান করেন যাতে করে তার প্রজারা তার ভিত্তিতে সেচের পানি সংরক্ষণ ও চাষাবাদের কাজে তা ব্যবহার করতে পারেন।
রাজজ্যোতিষী বাড়ি ফিরে এসে এই গণনায় লেগে যান এবং এ সংক্রান্ত সমস্ত পাঁজি ও বই পুস্তক ঘেঁটে একটি ফলপ্রসূ সুরাহায় পৌঁছার কাজে ব্রতী হন। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করেও তিনি এর সমাধান বের করতে ব্যর্থ হন। এদিকে তার স্ত্রী এবং পুত্রবধূ বার বার তাকে খাবার পরিবেশন করে খাবার আসনে বসাতেও ব্যর্থ হন। তিনি রাজকীয় নির্দেশ পালনে এতই মশগুল ছিলেন যে, খাবার দাবারের কথা ভুলেই গিয়েছিলেন। এই অবস্থায় তার পুত্রবধূ তাকে ডাকতে আসেন এবং বার বার ডেকেও কোন সাড়া না পেয়ে পেছনে দাঁড়িয়ে তার কাজ কর্ম লক্ষ্য করেন। তিনি বুঝতে পারেন যে, তার শশুর বৃষ্টির পূর্বাভাষ নিয়ে নিষ্ফল পরিশ্রম করে যাচ্ছেন এবং তাতে এতই নিমগ্ন রয়েছেন যে, খাওয়া-দাওয়া এবং বাইরের দুনিয়ার সবকিছু ভুলে গেছেন। পুত্রবধূটির নাম ছিল খনা। খনা তখন শ্বশুরের সামনে থেকে পাঁজি-পুস্তক সবকিছু সরিয়ে তাকে বললেন-
“কি কর শ্বশুর লেখা আর জোখা
চাইয়া দেখা আকাশের রেখা
কোদালে কুঁড়লে আকাশের গাঁ
এই ত হলো বৃষ্টির ধা -
চাষাকে বল বাঁধতে আল
আজ না হলে হবে কাল।”
রাজজ্যোতিষী সমস্যার সমাধান পেয়ে গেলেন এবং পরদিন রাজদরবারে তা পেশ করে রাজার প্রশংসাভাজন উপদেষ্টায় পরিণত হন। বাংলাদেশ, ভারত ও শ্রীলংকায় খনা একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত; খনার বচন মানুষের কাছে জনপ্রিয়তার শীর্ষে রয়েছে। গ্রামাঞ্চলে খনার বচনের বহুল প্রচলন রয়েছে। কথিত আছে যে রাজজ্যোতিষী খনার শ্বশুর তার সকল কাজে খনা-নির্ভর ছিলেন। তখন প্রকৃতির আচরণ, গ্রহ নক্ষত্রের আনাগোনা, পশু-পাখির অনুভূতি-প্রসূত ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া এবং মানুষের ঝোঁক প্রবণতা ও সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টি প্রভৃতিকে ভিত্তি করে মেধাকে কাজে লাগিয়ে জ্যোতিষরা সরকারকে পরামর্শ প্রদান করতেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই পরামর্শ নিখুঁত বলে প্রমাণিত হতো।
খনার বচন আজকে আমার লেখার বিষয়বস্তু নয়। কয়েক দিন আগে খুলনা গিয়েছিলাম। ঢাকা থেকে যশোর এবং যশোর থেকে খুলনা। আসার দিন যশোর থেকে ঢাকা অভিমুখী ফ্লাইট ছিল সকাল ৮-৩০টায়। বরাবর খুলনা থেকে ৭টায় রওনা হয়ে ফ্লাইট ধরতাম, কিন্তু এই দিন সবাই পরামর্শ দিলেন যে, অবশ্য অবশ্যই ভোর ৫-৩০টায় রওয়ানা হতে হবে। কেননা ঐ দিন ছিল পাটকল শ্রমিকদের অবরোধের দিন। তাই করলাম। কিন্তু অবরোধ থেকে বাঁচতে পারলাম না। খুলনার পাটকল শ্রমিকরা কিছুতেই অবরোধ তুলে আমাদের গাড়ি আসতে দিল না, ফিরিয়ে দিল এবং বাধ্য হয়ে বিকল্প গ্রামীণ পথে পাটকল এরিয়া এড়িয়ে মহাসড়কে উঠে যশোরের পথে আসতে হয়েছে। যশোরের নওয়াপাড়া পাটকলের কাছে এসেও একই সমস্যায় পড়তে হয়েছে। পথে ড্রাইভারের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা হলো। তার মুখে গ্রামগঞ্জ ও মফস্বলের যে গুমোট আবহাওয়ার কথা শুনলাম তা অত্যন্ত ভয়াবহ। তার ভাষায়, ক্ষমতাসীন দল ও তার অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা গ্রামগঞ্জের মানুষকে জিম্মি বানিয়ে বর্তমানে সারা দেশে একটি লুটপাট ও ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। তার দলীয় পরিচয় জানতে চাইলাম, তিনি বললেন যে, তিনি পেটের দলের সদস্য, খেটে খাওয়া মানুষ, কোনও রাজনৈতিক দল করেন না। তবে দেশের কথা ভাবেন। তিনি জানালেন যে, বর্তমান সময়ে ক্ষমতাসীন দল ও তার অঙ্গ সংগঠনের নব্য কিছু নেতানেত্রী তাদের চাঁদাবাজি, দখলবাজি, সন্ত্রাস, নৈরাজ্য, ব্যাভিচার, ঘুষ রিসওয়াত ও নানা অপকর্ম দ্বারা শুধু সরকারকে গণবিচ্ছিন্নই করছে না বরং দলের ত্যাগী ও পুরানো নেতাকর্মীদের থেকেও বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে। তার দুঃখ বর্তমান সরকার ও তার দল দেশকে এমনভাবে বিভক্ত করে ফেলেছে যে তার রেশ হয়তো শতাব্দীর পর শতাব্দী চলতে থাকবে। ড্রাইভার ভদ্রলোকের বয়স খুব বেশি নয়; ৩০ অথবা ৩৫ হবে। জিজ্ঞাসা করে জানলাম ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করেছে কিন্তু রাজনীতি বিশ্লেষণে তার পারঙ্গমতা আমাকে মুগ্ধ করেছে। এর অর্থ আমাদের দেশের সাধারণ মানুষেরা আর বাঙ্গাল নেই, রবীন্দ্রনাথের আক্ষেপকে উপেক্ষা করে মানুষ হয়ে গেছে। তার গ্রামের বাড়ির কথা বললেন এবং জানালেন যে, তার ইউনিয়নে বিএনপি করে অথবা আওয়ামী লীগ করে না এ রকম শত শত যুবক, কিশোর ও প্রৌঢ় ব্যক্তি এখন ঘরছাড়া। তারা বাড়িতে থাকতে পারেন না, দাড়ি টুপিওয়ালা অথবা নামাজিরা জামাতী, তাদের এলাকায় থাকাও অপরাধ। এদের প্রায় সকলের বিরুদ্ধেই মামলা, তিনি আরো বলেন যে, ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন দলভিত্তিক করে পাড়ায় মহল্লায় এবং বাড়িতে বাড়িতে হিংসা বিদ্বেষ যেভাবে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে তা আমাদের সমাজ এবং দীর্ঘ দিনের সামাজিক সংহতি ও বন্ধনকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। বিএনপি-জামায়াত ছাড়াও এই ধ্বংসাত্মক সিদ্ধান্তটি আওয়ামী লীগের নবীন প্রবীনের মধ্যেও মারাত্মক দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করেছে। এখন ক্ষমতার আশ্রয়ে থেকে তারা এক গ্রুপ অন্য গ্রুপের বিরুদ্ধে দেশীয় নয় মারাত্মক আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করতেও দ্বিধা করছে না। এতে সামগ্রিকভাবে সমাজ কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং দুষ্কৃতি প্রতিরোধ ও সুকৃতি প্রতিষ্ঠার জন্য আর কেউ অবশিষ্ট থাকছে না। তিনি ছাত্রলীগের কলেজ পড়ুয়া এক নেতার দৃষ্টান্ত উল্লেখ করে বললেন যে, এই ছেলেটির পরিবার এই সরকার ক্ষমতায় আসার আগে নিয়মিত বাজার সাজার করতে পারতো না। এখন তার বাড়িতে বিলাসবহুল ছয় তলা ভবন উঠেছে। তার আয়ের উৎস নিয়ে মানুষের মনে অনেক প্রশ্ন। ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন তার মতে একটি প্রহসন, এখানে অর্থ ও অস্ত্র দ্বৈত ভূমিকা পালন করছে। অন্যদের কথা বাদ দিলেও আওয়ামী লীগ আওয়ামী লীগকে শত্রু বানিয়ে ফেলেছে। যারা বিদ্রোহী অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের কিছু যোগ্যতা আছে, কিন্তু সরকার ও এমপিদের পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজরা। তারা অস্ত্র ঠেকিয়ে অথবা তার ভয় দেখিয়ে বিরোধী দলীয় প্রার্থীদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার অথবা প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে বিরত রাখছে। তার ধারণা অত্যাচার অবিচারের ফলে মানুষের মনে যে বিক্ষোভ ধূমায়িত হচ্ছে যে কোন সময় তার বিস্ফোরণ ঘটতে পারে এবং এর ফলে প্রতিহিংসার যে আগুন জ্বলে উঠবে তাতে আমাদের সমাজ জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যেতে পারে।
নির্যাতিত মানুষ যে হারে সরকারকে অভিশাপ দিচ্ছে ক্ষমতার শৃঙ্গে থাকা সরকার তার খবর পাচ্ছেন না। বিএনপি নেতৃত্বের কাঠামোগত দুর্বলতা অথবা ঘর গোছানোর বিলম্ব সরকারকে উজ্জীবিত করলেও গণ বিস্ফোরণ ঠোকানোর মতো তা যথেষ্ট নয় বলে তিনিসহ অনেকে বিশ্বাস করেন। জামায়াত সম্পর্কে তার ধারণা, দলটিকে আওয়ামী লীগ সরকার অস্বাভাবিকভাবে জনপ্রিয় করে দিয়েছে। জামায়াত নেতা কর্মীদের জেল জুলুম, মামলা ফাঁসি এবং দল ও তার অংগ সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্যে মিল নেই। দুর্নীতি-সন্ত্রাস ও অপকর্মে আকণ্ঠ নিমজ্জিত ক্ষমতাসীন দল যখন জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে মানবতা বিরোধী অপরাধের অভিযোগ তোলে তখন মানুষ হাসে। কেননা একই সমাজে বসবাস করার ফলে জামায়াতের প্রতিটি লোকের নাড়ি নক্ষত্র সম্পর্কে তারা জানে এবং যে কেউ তাদের বিভ্রান্ত করতে পারে না। জিজ্ঞাসা করলাম সরকারের ও মিডিয়ার অব্যাহত অপপ্রচারের মুখে আগামী দিনে মানুষ জামায়াত-বিএনপির ডাকে সাড়া দিবে কিনা। উত্তরে তিনি বললেন, জুলুম-নির্যাতনের বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে তা দীর্ঘ স্থায়ী হতে পারে না। একদিন তার পরিসমাপ্তি ঘটবে এবং তার প্রক্রিয়া যখন শুরু হবে তখন গণজোয়ার রোধ করা কারুর পক্ষেই সম্ভব হবে না।
কিন্তু তত দিনে দেশের ক্ষতি হয়ে যাবে। আওয়ামী লীগ যে ফসল ফলাচ্ছে তা চিটায় পরিণত হবে এবং মাথা যদি ঠোল হয় তা দিয়ে দেশ চালানো যায় না। একজন মাইক্রো ড্রাইভারের স্বতঃস্ফূর্ত অভিব্যক্তির মধ্যে আমি সরকারের জন্য অনেক ম্যাসেজ ও সতর্ক বাণী দেখতে পাই।
আলোচনার শুরুতে আমি খনার গল্প ও রাজজ্যোতিষীর কথা উল্লেখ করেছিলাম। এখন রাজজ্যোতিষী নেই, ভবিষ্যৎ বক্তা নেই। সরকারকে উপদেশ দেন এবং বাস্তব অবস্থা জানান গোয়েন্দারা। অনেকে মনে করেন গোয়েন্দারা কখনো সত্য কথা বা বাস্তব অবস্থা জানিয়ে সরকারের বিরাগভাজন হতে চান না। তারা মোসাহেবি করেন। এই মোসাহেবি সরকার এবং জনগণ উভয়েরই ধ্বংস ডেকে আনে।
বাংলাদেশ এখন একটি কারাগারে পরিণত হয়েছে। সরকার এখন নিজের ছায়া দেখেও ভয় পায়। গণমাধ্যম অথবা গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা সত্য কথা বললে সরকারের শত্রু হয়ে যান। তাদের জেলে দিয়েও তারা শান্তিতে ঘুমাতে পারেন না। এই অবস্থায় গোয়েন্দা রিপোর্টের ভিত্তিতে বছরের পর বছর কারাগারে আটক ব্যক্তিকেও সাত সমুদ্র তের নদীর ঐ পারে সাম্প্রতিক কালে কোনও সরকারি ব্যক্তিকে অপহরণ ও হত্যার ষড়যন্ত্রের সাথে সম্পৃক্ত করতে তারা দ্বিধা করেন না এবং তাদের এই বায়বীয় অভিযোগ জনগণকে বিশ্বাস করতে হয়। এই অবস্থা অব্যাহত থাকতে পারে না, সরকারের উচিত দেশ ও জাতির স্বার্থে গোয়েন্দা নয়, আকাশ ও জমিনের বাস্তব অবস্থা দেখে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা এবং দানব নয় মানবীয় আচরণে ফিরে আসা, এতে দেশও বাঁচবে, মানুষও বাঁচবে এবং দল জনপ্রিয়তা হারাবে না।
ড. মোঃ নূরুল আমিন

রবিবার, ১৭ এপ্রিল, ২০১৬

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

মার্কিন মানবাধিকার প্রতিবেদন


বর্তমান সভ্যতায় মানবাধিকারের বিষয়টি সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। দেশে-বিদেশে নানাভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। আর আমরা তো একথা জানি যে, উন্নত ও সম্মানজনক জীবন-যাপনের জন্য মানবাধিকার আবশ্যিক বিষয়। মানবাধিকার যতটা লঙ্ঘিত হবে মানুষের জীবন ততটাই মানবেতর হয়ে উঠবে। প্রসঙ্গত এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। সাধারণ মানুষ কিন্তু মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন করতে পারে না। কারও অধিকার ক্ষুণ্ন করতে হলে ক্ষমতা প্রয়োজন, কালাকানুন প্রয়োজন। অর্থাৎ মানবাধিকার  ক্ষুণ্ন করতে পারেন শক্তিমানরাই। এই কথা সমাজ, রাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক বলয়ে খুবই প্রাসঙ্গিক বর্তমান সময়ে।
মানবাধিকার নিয়ে বর্তমান বিশ্বে বিভিন্ন সংস্থা এবং রাষ্ট্র প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে, গবেষণাও করে থাকে। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০১৫ সালের মানবাধিকার প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুসারে প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার বিষয়ক প্রতিবেদন মার্কিন কংগ্রেসের কাছে পেশ করেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এবার দেশটির ৪০তম বার্ষিক মানবাধিকার প্রতিবেদনে ১৯৯টি দেশের মানবাধিকার প্রতিবেদন পেশ করা হয়েছে। বাংলাদেশ প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয় : বিচারবহির্ভূত হত্যা, নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক নির্যাতন, গণগ্রেফতার, কারাবন্দিত্ব, বিচার বিভাগের সামর্থ্যহীনতা, নাগরিকের ব্যক্তিগত অধিকার লঙ্ঘন, গুম, ব্লগার-অনলাইন ও গণমাধ্যমের ওপর হস্তক্ষেপ, নিম্নমানের কর্মপরিবেশ ও শ্রমিকদের অধিকারহীনতা বাংলাদেশের প্রধান মানবাধিকার সংকট। এছাড়াও প্রতিবেদনে বাংলাদেশের দুর্নীতি এবং সরকারের কাজকর্মের অস্বচ্ছতাকে মানবাধিকারের সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে বেশির ভাগ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক বিতর্কিত এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের ঘাটতি ছিল বলে মত দিয়েছেন। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে এবং যুদ্ধাপরাধের বিচারে সততা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়।
মার্কিন মানবাধিকার রিপোর্টে বাংলাদেশের যে চিত্র ফুটে উঠেছে তা মোটেও সম্মানজনক নয়। দেশের এমন চিত্র দেশের কোনো নাগরিকের ভালো লাগার কথা নয়। এমন রিপোর্ট সরকারের জন্যও অস্বস্তিকর। তবে মার্কিন মানবাধিকার রিপোর্টে যদি কোনো ত্রুটি থাকে কিংবা ভুল তথ্য পরিবেশিত হয়ে থাকে, তাহলে তার সংশোধন প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সরকার তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে প্রতিবাদও জানাতে পারে। তবে বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি যে কাক্সিক্ষত পর্যায়ে নেই তা দেশটির নাগরিকদের চাইতে আর কারো ভালো জানার কথা নয়। বিভিন্ন ক্ষেত্রেই মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। প্রসঙ্গত এখানে বলে রাখা ভাল যে, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উন্নত বিশ্ব যে প্রতিবেদন প্রকাশ করছে তা আরও অর্থবহ হতো, যদি ওইসব দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘিত না হতো। পরাক্রমশালী কোনো কোনো দেশ তো নিজের সীমানা পেরিয়ে ভিন্ন দেশেও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বড় বড় উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। এইসব উদাহরণ বিশ্বের মানবাধিকার পরিস্থিতিকে নাজুক করে তুলেছে। ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে তো বড় বড় দেশকে আমরা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় দিতে দেখেছি। এক্ষেত্রেও আত্মসমালোচনা প্রয়োজন, প্রয়োজন সংশোধন।

শনিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০১৬

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

বৈশাখী উৎসবে পান্তা ইলিশ ভক্ষণ করে ফুড পয়জনিং ॥ ২৫ জন হাসপাতালে


সেই ছোটকাল থেকে শুনে আসছি যে, বাঙ্গালি নাকি হুজুগে জাতি। অবশ্য বাঙ্গালি বলতে আমি সমস্ত বাঙ্গালিকে বলছি না। বাংলাদেশ ছাড়াও আরো কিছু বাঙ্গালি বাস করেন সীমান্তের ওপারে। ওরা হলেন, পশ্চিম বাংলার তথা ভারতীয় বাঙ্গালি। পশ্চিমবঙ্গে বসবাসকারী বাঙ্গালির আনুমানিক সংখ্যা ৯ কোটি। বাংলাদেশের বাঙ্গালির সংখ্যা ১৬ কোটি। ভারতের ৯ কোটি বাঙ্গালি হুজুগে জাতি কিনা সেটি এই বাংলায় বসে আমি সঠিক বলতে পারব না। তবে বেশ কয়েক যুগ থেকে লক্ষ্য করছি, মাঝে মাঝেই বাংলাদেশের বাঙ্গালিদের মধ্যে একটি হুজুগ ওঠে ও সেই হুজুগে তারা মেতে ওঠে। যেমন পান্তা ইলিশের হুজুগ। পহেলা বৈশাখে নববর্ষ বরণের সাথে পান্তা ইলিশের কি সম্পর্ক রয়েছে সেটি আমার জানা নাই। তবে পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে ইলিশ কেনার যে হুজুগ উঠছে কয়েক বছর ধরে, সেই হুজুগে ইলিশ মহাশয় এবার এক লাফে ১ লক্ষ ১৬ হাজারে উঠলেন। অন্য মানুষের মাথায় হাত। কি হবে সেই ইলিশ দিয়ে? সেই ইলিশ দিয়ে তারা বাংলা নববর্ষে পান্তা ইলিশ খাবে।
পান্তা ভাতকে নিয়ে  বৈশাখী সাহেবদের এ কি নির্মম রসিকতা! ইলিশ নিয়ে পাগলামি এমন পর্যায়ে গেল যে, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পর্যন্ত ঘোষণা করলেন যে, নববর্ষে তিনি ইলিশ মাছ খাবেন না। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ইলিশ খাওয়া নিষিদ্ধ করতে হলো। তাও কি রক্ষা আছে? নববর্ষে বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলায় সরকারি প্রশাসনের উদ্যোগে ইলিশ খাওয়ার ধুম পড়ে যায়। আর সেই ইলিশ খেয়ে ২৫ জন আদম সন্তান গুরুতর পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হয়।
পহেলা  বৈশাখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার খাওয়ার তালিকায় পান্তা ইলিশ ছিল না। গণভবনে এ দিনের মেন্যুতে খিচুড়ির সঙ্গে ছিল বেগুন ভাজি, ডিম ও মুরগির মাংস ভুনা।
পহেলা  বৈশাখে পান্তা ইলিশ খাওয়া প্রসঙ্গে গত সোমবার সচিবালয়ে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বলেন, পহেলা  বৈশাখ পালনের সঙ্গে ইলিশ খাওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা গ্রামে বড় হয়েছি, গ্রামে পহেলা  বৈশাখের দিন হালখাতা হয়েছে। হালখাতা উপলক্ষে মিষ্টিমুখ করেছি। কিন্তু পান্তা ইলিশ খাওয়ার কোনো রেওয়াজ ছিল না। এমনকি পান্তা ভাত খাওয়ার নমুনাও দেখিনি।
পহেলা  বৈশাখে ইলিশ নিয়ে এতো মাতামাতি তা শহরের বিষয় এমন মন্তব্য করে আসাদুজ্জামান নূর বলেন, হয়তো শহরের কোনো একজন মানুষ পহেলা  বৈশাখের দিন পান্তা ইলিশ খেয়েছিল। সেটি নিয়ে এখন হুজুগ চলছে।
বিদগ্ধজনদের মতে, একদিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখ একসঙ্গে এতো ইলিশ না খেয়ে সারা বছর ধরে বাংলাদেশের মানুষ যাতে ইলিশ খেতে পারে সে দিকে দৃষ্টি দেওয়া উচিত। পহেলা  বৈশাখে ইলিশ খাওয়াকে উন্মাদনা বলে অভিহিত করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী।
পহেলা  বৈশাখে পান্তা ইলিশ খাওয়া প্রসঙ্গে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র বলেন, পহেলা  বৈশাখ পালনের সঙ্গে ইলিশ খাওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। তাই পহেলা  বৈশাখে বাংলাদেশের মানুষের ইলিশ খাওয়া পরিহার করা উচিত। এতে জাটকা নিধন বন্ধ থাকবে। পহেলা  বৈশাখের নামে জাটকা নিধন না চালিয়ে সারা বছরের জন্য মানুষ যাতে ইলিশ খেতে পারে সকলের সম্মিলিতভাবে সেই চেষ্টা নেওয়া উচিত।
এবার পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পান্তা ইলিশ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন ভাইস চ্যান্সেলর  প্রফেসর ড. এস এম ইমামুল হাকিম। গত বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে বর্ষবরণ আয়োজনের নানা দিক তুলে ধরে তিনি বলেন, বাঙালির ইতিহাস ঐতিহ্যের সঙ্গে কোথাও পান্তা ইলিশের মিল আছে বলে জানা নেই আমাদের।
ভি সি আরও বলেন, নববর্ষের এ সময়টি হচ্ছে রূপালী ইলিশের প্রজনন মৌসুম। এ সময়ে পহেলা  বৈশাখ উদযাপনে রূপালি ইলিশ খাওয়া মানে হচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতি ধ্বংস করা। কাজেই নববর্ষ উদযাপনে পান্তা ইলিশ ছাড়া সব ধরনের আয়োজনই ছিল বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে।
॥দুই॥
পত্রপত্রিকার খবরে প্রকাশ, এদেশে পশ্চিম বঙ্গীয় সংস্কৃতি অনুপ্রবেশের চ্যাম্পিয়ন ছায়ানট পর্যন্ত পান্তা ইলিশের বিরুদ্ধে বিবৃতি দিয়েছে। গতকাল শুক্রবার পান্তা ইলিশের বিরুদ্ধে প্রবল জনমত লক্ষ্য করে তারা এই বিবৃতিটি দিতে বাধ্য হয়। ঐ বিবৃতিতে বলা হয়, রাজধানী ঢাকার পহেলা  বৈশাখের মূল অনুষ্ঠানের কেন্দ্র বিন্দু হচ্ছে রমনা বটমূলে ছায়ানটের সঙ্গীতানুষ্ঠান। ছায়ানটের এই আয়োজনকে কেন্দ্র করেও পান্তা ইলিশের বিক্রির ব্যবস্থা হয় অনুষ্ঠানের আশেপাশে।
ছায়ানটের নির্বাহী কর্মকর্তা সিদ্দিক বেলাল একটি পত্রিকাকে বলেন, ছায়ানটের অনুষ্ঠানের আশেপাশে বিক্রি হওয়া পান্তা ইলিশ বিক্রির সঙ্গে আমাদের কোনও সম্পর্ক নেই। বরাবরই আমরা বিবৃতি দিয়ে এই কর্মকা-ের বিরোধিতা করে এসেছি।
পান্তা ইলিশের এই হুজুগ ও উন্মাদনায় পড়ে বাগের হাটে ২৫ জন মানুষকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। খবরে প্রকাশ, বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলা প্রশাসন আয়োজিত বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে পান্তা ইলিশ খেয়ে অন্তত ২৫ জন অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত অন্তত ২৫ জনকে কচুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। এদের মধ্যে কচুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শমসের আলী, স্থানীয় সংবাদ কর্মী, শিক্ষকসহ বিভিন্ন শ্রেণীপেশার লোক রয়েছেন।
কচুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক সাইফুল ইসলাম জানান, রাত ১২টা থেকে সকাল পর্যন্ত ফুড পয়জনিংয়ে ২৫ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তারা সবাই পহেলা  বৈশাখে ওই অনুষ্ঠানের খাবার খেয়েছেন।
অপর এক খবরে প্রকাশ, পান্তা ইলিশের এই বৈশাখী উন্মাদনায় দেশের জাটকা নিধন উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলেছে। একটি বাংলা পত্রিকার খবর অনুযায়ী মৎস্য অধি দফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, পহেলা  বৈশাখে ইলিশের চাহিদা থাকায় জেলেরা নির্বিচারে জাটকা ধরছে। নিষিদ্ধ জেনেও বেশি দামের প্রলোভনে অপরাধ করছে তারা।
মৎস্য অধি দফতরের জাটকা সংরক্ষণ, জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান এবং গবেষণা প্রকল্পের সহকারী পরিচালক মাসুদ আরা মমি বলেন, পহেলা  বৈশাখ উপলক্ষে ইলিশের চাহিদা বেশি থাকায় জাটকা ধরছে জেলেরা। বরিশাল সহ কিছু জায়গায় ইতিমধ্যে বেশি দামে বিক্রি করার উদ্দেশ্যে ইলিশ সংরক্ষণ করা হচ্ছে। তবে মৎস্য অধি দফতর জাটকা ধরা বন্ধ করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে তিনি জানান। জনাব মাসুদ আরা জানান, অধি দফতর নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছে। তবে পহেলা  বৈশাখে যেহেতু মানুষ ইলিশ খাচ্ছে, সেটিকে তো অগ্রাহ্য করার সুযোগ নেই। তবে ক্রেতাকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে, সেটি যেন জাটকা না হয়।
॥তিন॥
সুখের বিষয়, বিলম্বে হলেও এ ব্যাপারে মানুষের চেতনা ফিরছে। পান্তা ইলিশ এবং বৈশাখ উদযাপন নিয়ে গত কয়েক বছর ধরে যে পাগলামি, উন্মাদনা ও হুজুগ চলছিল এবার হুজুগ সৃষ্টিকারীদেরই একটি অংশ মুখ খুলেছেন। এ ব্যাপারে অধ্যাপক যতীন সরকার মনে করেন, পান্তা ইলিশকে  বৈশাখের উপলক্ষ করা বানোয়াট ও ভণ্ডামির অংশ। এসব উদ্যোগ যারা নিয়েছে তারা সাংস্কৃতিক চোর। স্বাধীনতার পর থেকে চোরেরা এই সংস্কৃতি চালু করেছে।
এমিরেটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তার এক লেখায় বলেন, গরিব মানুষের খাবার পান্তা ভাত। রাতে খাওয়ার পর অবশিষ্ট ভাত রাখার কোনও উপায় ছিল না; তাই পানি দিয়ে রাখা হতো এবং সকালে আলু ভর্তা, পোড়া শুকনো মরিচ ইত্যাদি দিয়ে খাওয়া হতো। আমিও ছোট বেলায় খেয়েছি। কিন্তু এখন পান্তা ইলিশ ধনী লোকের বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে এবং এটা দুর্মূল্যও বটে যা সাধারণ মানুষের ধরা ছোঁয়ার বাইরে। এর মাধ্যমে আমাদের সংস্কৃতিকে সম্মান দেখানোর পরিবর্তে ব্যঙ্গ করা হচ্ছে।
এ ব্যাপারে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান বলেন, ইলিশ খাওয়ার সিজন হচ্ছে আষাঢ় শ্রাবণ মাস।  বৈশাখ তো ইলিশ খাওয়ার সময় না। ৯০ এর দিকে এইটা শুরু হয়েছে। আগে যখন পহেলা  বৈশাখ উদযাপিত হতো, তখন গ্রামের অবস্থাপন্ন এবং ধনী পরিবারে খাবারের আয়োজনের মধ্যে থাকত চিড়া, মুড়ি, সাধারণ খই, বিভিন্ন ধানের খই, দই, লুচি, খেজুরের গুড়, খিচুড়ি, বড় কই মাছ, বড় রুই মাছ ইত্যাদি। কিন্তু ইলিশ আর পান্তার কোনও ব্যাপার ছিল না। শামসুজ্জামান খান বলেন, এখন তো শহুরে নাগরিকদের হাতে টাকা এসেছে, তাই এক লাখ-দেড় লাখ টাকা খরচ করে ওরা  বৈশাখে ইলিশ খায়।
এছাড়াও আরো সুধীবৃন্দ পহেলা  বৈশাখে পান্তা ইলিশের সম্পৃক্ততা নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলেছেন। বিরোধিতা করে এসেছেন এই উদ্ভট বানোয়াট আয়োজনের। এসিয়াটিক সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম এক লেখায় বলেছেন, সম্প্রতি পহেলা  বৈশাখের উৎসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পান্তা ইলিশ খাওয়ার রীতি। এই পান্তা ইলিশ খাওয়ার প্রচলন আগে ছিল না।
বিশিষ্ট চলচ্চিত্রকার আমজাদ হোসেন লিখেছেন, পহেলা  বৈশাখে ইলিশ পান্তার কালচার একদমই নতুন প্রজন্মের।
মরহুম সাংবাদিক ফয়েজ আহমদ পহেলা  বৈশাখের উৎসব সম্পর্কে একাধিক প্রবন্ধ, নিবন্ধ এবং সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছেন, পহেলা  বৈশাখের সঙ্গে পান্তা ইলিশের কোনও সম্পর্ক নেই। এটা কোনও গরিব মানুষের খাবার নয়। গ্রামের মানুষ ইলিশ মাছ কিনে পান্তা ভাত  তৈরি করে খায়, এটা আমি গ্রামে কখনও দেখিনি, শুনিনি।
॥চার॥
সবশেষে বাংলা নববর্ষ অর্থাৎ পহেলা বৈশাখ উদযাপন সম্পর্কে একটি কথা। এ সম্পর্কে অনেক কথাই বলার ছিল। কিন্তু আজ আমি শুধু পান্তা ইলিশের মধ্যেই লেখাটি সীমাবদ্ধ রাখতে চাচ্ছি। তবুও শেষ করার আগে পহেলা  বৈশাখ সম্পর্কে একটি কথা না বললেই নয়। এখন পহেলা বৈশাখ বিগত কয়েক বছর ধরে যে চেহারায় আবির্ভূত হচ্ছে আবহমান কালের বাংলাদেশে পহেলা  বৈশাখের সেই চেহারা ছিল না। অতীতে উৎসব করে নববর্ষ পালনের তেমন কোনো ঘটনার সাক্ষাৎ পাওয়া যায় না। গ্রামীণ জনজীবনে কৃষি ও ব্যবসার সঙ্গে বাংলা সনের ওতপ্রোত সম্পর্ক থাকার কারণে অতীতে গ্রামে গঞ্জে মেলা ও হালখাতার প্রচলন ছিল। শহুরে জনজীবনে এসব খুব একটা দেখা যেত না। এখন সবকিছু যেন উল্টে গেছে। গ্রামে গঞ্জে এখন মেলা ও হালখাতা প্রায় উঠেই গেছে। পক্ষান্তরে শহরে নববর্ষ উদযাপনের ঘটা শুরু হয়েছে। এ উপলক্ষে বিভিন্ন অনুষ্ঠান, সমাবেশ, মিছিল ইত্যাদি হচ্ছে। নববর্ষ ব্যবসা বাণিজ্যেরও একটা উপলক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পহেলা  বৈশাখে নববর্ষ উদযাপনের নামে বাদ্য বাজনা, আলপনা, মুখোশ নৃত্য, রঙখেলা, নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশা প্রভৃতিকে চিরায়ত বাঙালি সংস্কৃতি বলে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে যার সঙ্গে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আচরিত সংস্কৃতির কোনো মিল নেই।
পহেলা বৈশাখকে যে চেহারায় এনে দাঁড় করানো হয়েছে সেটার পেছনে সিংহভাগ কারসাজি রয়েছে দেশের এক শ্রেণীর ব্যবসায়ী সমাজ ও কর্পোরেট হাউজের। অন্য কোনো সময় এ সম্পর্কে বিস্তারিত লেখার ইচ্ছা রইল।
আসিফ আরসালান

Ads