বুধবার, ১৫ আগস্ট, ২০১২

১৫ই আগস্ট এখন এবং ১৯৭৫ সালে



ব দ রু দ্দী ন উ ম র
শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুদিবসে আজকাল সংবাদপত্রে তাঁর ওপর লেখালেখির শেষ থাকে না। এ দিবস উপলক্ষে শুধু আওয়ামী লীগ নয়, অন্য অনেক আওয়ামীপন্থী সংগঠনই কর্মসূচি পালন করে। জনগণের মধ্যে এ নিয়ে কোনো আলোচনার উত্সাহ না থাকলেও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল, তাদের সঙ্গে সম্পর্কিত সংগঠন ও লোকজন, একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবী এ দিনটিতে শেখ মুজিবের বিষয়ে নানা ধরনের আলোচনা করে থাকেন। শেখ মুজিব নিহত হওয়ার পর অনেক বছর ধরে এ ধরনের কিছু দেখা যায়নি। যেসব বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক ব্যক্তি এখন শেখ মুজিবের ওপর আলোচনা ও লেখালেখি করে হুলুস্থুল করতে থাকেন তাঁদের অনেকেই বৃদ্ধ অথবা প্রৌঢ়। সে সময়ে তাঁরা আওয়ামী লীগের সঙ্গেই ছিলেন। তাদের থেকে অনেক উপকার আগে পেয়েছিলেন এবং এখনও পাচ্ছেন। সেই হিসেবে এখন যেভাবে তাঁরা শেখ মুজিবের ওপর উষ্ণ ভাষায় আলোচনা ও লেখালেখি করেন এটা স্বাভাবিক। কৃতজ্ঞতাবোধের প্রকাশ, এমনিতে কোনো নিন্দার ব্যাপার নয়। শুধু ব্যক্তিগতভাবে ১৯৭২-৭৫ সালেই নয়, পরবর্তীকালেও যারা নতুন শ্রেণী হিসেবে আওয়ামী লীগের দ্বারা উপকৃত হয়েছেন এবং ভবিষ্যতে আরও উপকৃত হওয়ার আশা করেন তাঁদের ব্যক্তিগত স্বার্থের সঙ্গে আওয়ামী লীগের উত্থান-পতন সম্পর্কিত। কাজেই তাঁরা আওয়ামী লীগকে সর্বতোভাবে সমর্থন করবেন এবং আওয়ামী লীগের দ্বারা প্রচারিত অনেক পরিকল্পিত মিথ্যাকেও অকাট্য সত্য হিসেবে তুলে ধরতে সচেষ্ট হবেন এর মধ্যে অবাক হওয়ার কিছু নেই। শুধু তা-ই নয়, যখন এই ধরনের রাজনৈতিক ব্যক্তি এবং বিশেষ করে বুদ্ধিজীবীরা ‘পুরাতন সত্যের’ সঙ্গে ‘নতুন সত্য’ যোগ করার ব্যাপারে সবিশেষ দক্ষতার পরিচয় দেন, তখনও এতে অবাক হওয়ার মতো কিছু থাকে না। ‘জান বাঁচানোর জন্য সবকিছু ফরজ’ বলে একটা কথা প্রচলিত আছে, যা চরম সুবিধাবাদী ও দুর্বৃত্তরা বলে থাকে। ঠিক তেমনিভাবে স্বার্থের জন্য সবকিছুই অনুমোদনযোগ্য এমন চিন্তা সুবিধাবাদীদের মস্তিষ্ক আচ্ছন্ন রাখে। এসব কথাই আজকের ১৫ই আগস্ট বিশেষভাবে মনে করার মতো।
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বাংলাদেশের তত্কালীন রাষ্ট্রপতি ও বাকশাল নেতা শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর একটি গ্রুপের দ্বারা সপরিবারে নিষ্ঠুরভাবে নিহত হয়েছিলেন। ক্ষমতায় থাকার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় একটি দেশের অবিসংবাদী ও বিপুল জনপ্রিয় একজন নেতার এভাবে নিহত হওয়ার ঘটনা ইতিহাসে আর কোথাও ঘটার দৃষ্টান্ত নেই। কী কারণে এ ঘটনা সম্ভব হয়েছিল এর কারণ বোঝা তত্কালীন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ইতিহাস ও ঘটনাবলীর পর্যালোচনা এবং বিশ্লেষণ ছাড়া সম্ভব নয়। এ কাজে কোনো যথার্থ ঐতিহাসিক আজ পর্যন্ত হাত দেননি। কিন্তু কারণ যা-ই হোক, ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান কয়েকজন সামরিক আততায়ীর হাতে নিহত হয়েছিলেন। সেই ঘটনার সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের যোগাযোগের বিষয়টিও এখন কারও অজানা নয়। সামরিক অফিসারদের একটা অংশ এবং আওয়ামী লীগের লোকজনরা যৌথভাবেই এই ঘটনা ঘটিয়েছিল। কিন্তু শুধু এটুকু বললেই এর সঠিক কারণ বোঝার উপায় নেই। দেশে একটা বাস্তব পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সুযোগ নিয়েই শেখ মুজিব হত্যা এবং তাঁর শাসন উচ্ছেদ করার পরিকল্পনা তৈরি হয়েছিল। সেই বাস্তব পরিস্থিতিকে বাদ দিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার বিষয়টির ব্যাখ্যা হতে পারে না।
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হয়েছিলেন। যে কোনো লোকই এভাবে ঘটনাচক্রে নিহত হতে পারেন। কিন্তু এক্ষেত্রে যা উল্লেখযোগ্য তা হলো, তাঁর মতো একজন নেতার নিষ্ঠুরভাবে সপরিবারে নিহত হওয়ার পরবর্তী পরিস্থিতি ও ঘটনাবলী। খুব ভোর বেলা এই ঘটনা জানাজানির পর দলে দলে মানুষ রাস্তায় বের হয়ে আসেন। লক্ষ্য করার বিষয় ছিল এঁরা বেরিয়ে এসেছিলেন কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে, ঘটনার প্রতিবাদের জন্য নয়। একজনকেও এর প্রতিবাদ করতে দেখা যায়নি। এমনকি আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও এর বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ ছিল না। তারা কেউ রাস্তায় বের হয়ে বিক্ষোভ দেখায়নি। তাদের মতো সরকারি ক্ষমতায় থাকা বড় একটি দলের নেতাকর্মীদের পক্ষ থেকে একটা লিফলেট কেউ কোথাও দেখেনি। দেয়ালে কোনো পোস্টার বা চিকা দেখা যায়নি।
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আমাদের জনগণের ওপর সর্বাত্মক সশস্ত্র এক ফ্যাসিস্ট আক্রমণ শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সমগ্র অংশ যেমন দেশের মানুষকে পাকিস্তানি আক্রমণের চরম বিপদের মধ্যে ফেলে দিয়ে আত্মরক্ষার জন্য ভারতে পাড়ি দিয়েছিল, ঠিক তেমনিভাবেই ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার পর তারা নিজেদের রক্ষা করার জন্য গা-ঢাকা দিয়েছিল।
শুধু তা-ই নয়, এখানে অবশ্যই বলা দরকার যে, শেখ মুজিবের মৃতদেহ তাঁর ৩২ নম্বর ধানমন্ডির বাড়ির সিঁড়ির ওপর পড়ে থাকা অবস্থাতেই ১৫ই আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানের মন্ত্রিসভার সদস্যরা বঙ্গভবনে গিয়ে মুশতাক আহমদের মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন। বলা হয়ে থাকে যে, তাঁদের নাকি জোর করে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং তাঁরা না গেলে তাঁদেরকেও হত্যা করা হতো। কিন্তু যাঁরা প্রকৃত দেশপ্রেমিক ও বিপ্লবী তাঁদের ধরে নিয়ে গিয়ে বা মৃত্যুভয় দেখিয়ে যে এ ধরনের কাজ করানো যায় না এর দৃষ্টান্ত ইতিহাসে অগুনতি, মাত্র তিনজন মন্ত্রী ও সেইসঙ্গে পূর্বেই মন্ত্রিসভা থেকে বিতাড়িত তাজউদ্দীন ছাড়া বাকি সবাই মোশতাকের মন্ত্রিসভায় যোগদান করে শুধু নিজেদেরকেই নয়, নিজেদের দল আওয়ামী লীগকেও কলঙ্কিত করেছিলেন। কোনো ‘দেশপ্রেমিক’ ও ‘বিপ্লবী’ সাবেক ছাত্রলীগ নেতাও ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট তাঁদের দেশপ্রেম ও বিপ্লবী চরিত্রের কোনো স্বাক্ষর রাখেননি!
কিন্তু এঁরা নিমকহারাম নন! কাজেই আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক অবস্থায় আসার পর, বিশেষত আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে ঘাপটি মেরে থাকা আওয়ামী লীগ ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতারা নিজেদের বীরত্বপূর্ণ দেশপ্রেম ও শেখ মুজিবের প্রতি আনুগত্য দেখানোর উদ্দেশ্যে মাঠে নামেন। পুরনো এবং নতুন বুদ্ধিজীবীরা নিজেদের বুদ্ধির বিকাশ ঘটিয়ে বড় আকারে শেখ মুজিবকে মহাপুরুষ হিসেবে গৌরবান্বিত করার জন্য যা কিছু করা দরকার সবই বলেন। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, এই বক্তব্যের সঙ্গে ঐতিহাসিক সত্যের কোনো সম্পর্ক নেই। সম্পর্ক আছে নোংরা স্বার্থচিন্তার। কাজেই ১৫ই আগস্ট এলে এখন তাঁদের কলম আর কোনো বাধা মানে না। সত্যমিথ্যার ঊর্ধ্বে উঠে তাঁরা নিজেদের কলম চালনা করেন। আর যেহেতু ইতিহাসচর্চা বলে এদেশে কিছু নেই, এই লেখকরা ইতিহাস বিষয়ে সম্পূর্ণ অজ্ঞ। কাজেই সরকারি পরিকল্পনা ও নিজেদের স্বার্থপ্রণোদিত কল্পনার সূত্র ধরে এখন তাঁরা শেখ মুজিবুর রহমানের পূজা-অর্চনায় নিযুক্ত থাকেন।
প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্রে বলা হতো যে রাষ্ট্রবিপ্লব ও শ্মশানযাত্রার সময় বন্ধু হিসেবে যে এগিয়ে আসে সেই প্রকৃত বন্ধু। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে রাষ্ট্রবিপ্লবের সময় যারা বাংলাদেশের জনগণকে বিপদের মধ্যে রেখে নিজেরা প্রাণ বাঁচানোর জন্য ভারতে পালিয়েছিল, এদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে পাকিস্তানি ফ্যাসিস্ট সামরিক বাহিনীর মোকাবিলার কোনো কর্মসূচি যাদের ছিল না, তারা এবং তাদের উত্তরসূরিরাই ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিব হত্যার পর গা-ঢাকা দিয়েছিল এবং আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তারা এখন শেখ মুজিবুর রহমানের গুণকীর্তন ও পূজা-অর্চনায় বিভোর। এই সুখের পায়রাদের মুজিব-বন্দনায় আজ সভাসমিতি মুখর, সংবাদপত্রের পাতা ভর্তি, টেলিভিশনের টক শোতে বাচালদের রাজত্ব। যেসব বুদ্ধিজীবী এক্ষেত্রে মুজিব কীর্তনের দৌড়ে অংশগ্রহণ করে জোর লেখালেখি করছেন, কথা বলছেন ইতিহাস বিষয়ে তাঁদের অজ্ঞতা এবং সুবিধাবাদী হিসেবে তাঁদের ঘৃণ্য চরিত্র কোনোটিই অনুমোদনযোগ্য নয়।
১৫.৮.২০১২

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Ads